ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি : গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নেওয়া ভাট গাছ শুধু একটি সাধারণ ঝোপজাতীয় উদ্ভিদ নয়, বরং এটি আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য ও পরিবেশের এক মূল্যবান অনুষঙ্গ। পতিত জমি, রাস্তার ধারে কিংবা বনভূমির প্রান্তে বেড়ে ওঠা এই গাছ প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী প্রাণীর আবাস ও খাদ্য নিশ্চিত করে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও মাটি ক্ষয় প্রতিরোধেও ভাট গাছের অবদান অনস্বীকার্য।
উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে ভাট গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrun in Fortunatun । এটি Lamiaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি সপুষ্পক ঝোপজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত গাছটি তিন থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর কাণ্ড সবুজাভ ও শক্ত প্রকৃতির। পাতা বড়, ডিম্বাকার ও কিছুটা রুক্ষ; পাতায় এক ধরনের তীব্র গন্ধ রয়েছে।
ভাট গাছের ফুল সাদা ও হালকা গোলাপি আভাযুক্ত, যা গুচ্ছাকারে ফুটে। ফুলের মাঝখানে লম্বা পুংকেশর বেরিয়ে থাকে, যা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ভাট ফল প্রথমে সবুজ এবং পাকার পর নীলচে কালো রঙ ধারণ করে।
সাধারণত বর্ষাকাল থেকে শরৎকাল। বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবর মাসে এই গাছে বেশি ফুল দেখা যায়। তবে স্থান ও পরিবেশগত কারণে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসেও কোথাও কোথাও ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুল ফোটার সময় সবুজ পাতার মাঝে সাদা ফুল প্রকৃতিতে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
ভাট ফুলের মধু সংগ্রহ করতে প্রজাপতি ও মৌমাছি আসে, ফলে পরাগায়নের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া ঝোপজাতীয় হওয়ায় ছোট প্রাণীদের আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করে। মাটি ক্ষয় রোধেও এর অবদান রয়েছে।
লোকজ চিকিৎসায় ভাট গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়। এর পাতা চর্মরোগ ও ক্ষত নিরাময়ে কাজে লাগে। মূল জ্বর পেট ব্যথা ও কৃমিনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাতার রস ও পেস্ট বাত ব্যথা উপশমে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। পরিবেশগত দিক দিয়ে ভাট গাছের গুরুত্ব রয়েছে। এটি মাটি ক্ষয় রোধে সহায়তা করে এবং ছোট প্রাণীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে থাকে। ভাট গাছ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সর্বোপরি ভাটগাছ আমাদের দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। এটি যেমন প্রকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তেমনি মানুষের উপকারেও আসে। তাই এই গাছ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে আমাদের এই প্রাকৃতিক অমূল্য সম্পদ ভাট গাছ রক্ষা করা উচিত।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সাবেক সহকারি শিক্ষা অফিসার রেনেন্থেরা সুলতানা বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও দেশীয় উদ্ভিদ সম্পর্কে জানানো অত্যন্ত জরুরি। ভাট গাছের মতো দেশীয় উদ্ভিদ শুধু সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না, বরং পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। বিদ্যালয় পর্যায়ে পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রমে এসব গাছের গুরুত্ব তুলে ধরা উচিত।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি সাইফুল ইসলাম তালুকদার বলেন, আমাদের গ্রামের অনেক প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আজ অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। ভাট গাছ তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সচেতনতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সর্বোপরি ভাট গাছ আমাদের দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় উদ্ভিদ। এটি যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তেমনি মানুষের নানাভাবে উপকারেও আসে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের স্বার্থে ভাট গাছ রক্ষা ও পরিচর্যায় সচেতনতা বাড়াতে হবে।
মন্তব্য (০)