রংপুর ব্যুরো : ২০ বছরের পুরোনো বাস ও মিনিবাসের চলাচল বন্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং ফিটনেস থাকা গাড়ি সড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে রংপুর বিভাগীয় বাস-মিনিবাস মোটর মালিক সমিতি। এ দাবিতে আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না এলে ১ নভেম্বর থেকে রংপুর বিভাগের সব জেলায় সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সমিতির নেতারা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর)রাতে রংপুর নগরীর জেলা মোটর মালিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ আলটিমেটাম দেওয়া হয়।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সমিতির নেতারা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রংপুর বিভাগীয় বাস-মিনিবাস মোটর মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম বসুনিয়া। এতে বলা হয়, গাড়ির বয়সের ভিত্তিতে চলাচল বন্ধ না করে এর প্রকৃত অবস্থা, যান্ত্রিক সক্ষমতা ও ফিটনেসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়বে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিআরটিএর নীতিমালা অনুযায়ী বাস ও মিনিবাসের ইকোনমিক লাইফ ২০ বছর এবং ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নিয়মের কারণে সারা দেশে নিবন্ধিত ২০ বছরের পুরোনো প্রায় ৫৬ হাজারের বেশি বড় বাস ও ২৮ হাজারের বেশি মিনিবাস চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবহন মালিকদের দাবি, এত বিপুলসংখ্যক গাড়ি একসঙ্গে চলাচলের বাইরে চলে গেলে বিকল্প পরিবহন দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হবে। সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশে নতুন নিবন্ধন পাওয়া বাসের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৭৩৬টি। এর মধ্যে মিনিবাস ছিল ২২০টি। ফলে পুরোনো গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন গাড়ি যুক্ত না হলে যাত্রী পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
‘বয়স নয়, ফিটনেসই হোক মূল বিবেচ্য’
সংবাদ সম্মেলনে পরিবহন নেতারা বলেন, একটি গাড়ির বয়স ২০ বছর হলেই সেটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায় না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় মেরামতের মাধ্যমে অনেক পুরোনো গাড়িও চলাচলের উপযোগী রাখা সম্ভব। তাই শুধু বয়সের ভিত্তিতে গাড়ি বাতিল না করে কারিগরি পরীক্ষা ও ফিটনেসের ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তাঁদের বক্তব্য, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৪০ ধারায় নির্ধারিত শর্তে চেসিস ছাড়া গাড়ির অন্যান্য যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় গাড়ির বয়সকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হলে আইনের ওই বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা দাবি করেন।
রংপুর অঞ্চলের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে পরিবহন নেতারা বলেন, এ অঞ্চল কৃষিনির্ভর। এখানকার অনেক পরিবহন মালিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তাঁদের পক্ষে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় করে নতুন বাস কেনা সম্ভব নয়। পুরোনো গাড়ি বাতিল করে নতুন গাড়ি কেনার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে অনেক মালিক আর্থিক সংকটে পড়বেন। এর প্রভাব পড়বে পরিবহন ব্যবসা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও যাত্রীসেবায়।
নেতাদের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ও কিছু আমদানিকারককে সুবিধা দিতে আমলাতান্ত্রিক পর্যায় থেকে সরকারকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বাস্তবতা বিবেচনা না করেই পরিবহন মালিকদের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের আশঙ্কা
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিপুলসংখ্যক পুরোনো বাস একযোগে বাতিল করে নতুন গাড়ি আমদানি করতে হলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, সচল রাখা সম্ভব এমন গাড়িতে প্রয়োজনীয় নতুন যন্ত্রাংশ সংযোজন ও মেরামতের মাধ্যমে পরিবহনসেবা চালু রাখলে তুলনামূলক কম খরচে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
পরিবহন নেতাদের মতে, পরিবেশ সুরক্ষা ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি। তবে সে ক্ষেত্রে গাড়ির প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের পক্ষে তাঁরা নন; বরং ফিট থাকা গাড়ি যেন শুধু বয়সের কারণে বাতিল না হয়, সেটিই তাঁদের মূল দাবি।
ধর্মঘট হলে ভোগান্তিতে পড়বেন যাত্রীরা
রংপুর বিভাগে বাস চলাচল বন্ধ হলে আন্তজেলা ও দূরপাল্লার যাত্রীদের পাশাপাশি কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দাবি পূরণ না হলে ১ নভেম্বর থেকে সর্বাত্মক ধর্মঘটের কর্মসূচি বাস্তবায়নের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মালিক সমিতির নেতারা।
রংপুর জেলা মোটর মালিক সমিতির উপদেষ্টা ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন রংপুর বিভাগীয় বাস-মিনিবাস মোটর মালিক সমিতির সভাপতি শ্রী ভবানী শংকর আগরওয়াল, সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিমুল বারী রাজসহ পরিবহন খাতের নেতারা।
পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা জানান, ২৯ অক্টোবরের মধ্যে তাঁদের দাবির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা চান তাঁরা।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ১ নভেম্বর থেকে রংপুর বিভাগের সর্বত্র পরিবহন ধর্মঘটের কর্মসূচি পালন করা হবে।
মন্তব্য (০)