নড়াইল প্রতিনিধি : ভাঙ্গণে দিশেহারা হয়ে পড়েছে মধুমতি নদী পাড়ের মানুষ। গত দুই সপ্তাহে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার লোহাগড়া ইউনিয়নের ছাগলছিড়া এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। গ্রামের নদী তীরবর্তী প্রায় ৩৫০টি কৃষি পরিবারের বসতবাড়ী নদীতে বিলিণ হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ২৫০ একর ফসলি জমি,তিন কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নদীতে চলে গেছে। ঝুকির মধ্যে রয়েছে আরো প্রায় ২৬০টি পরিবার।
স্থানীয়দের দাবি,এক সময় এসব এলাকায় প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ পরিবারের বসতবাড়ি ছিল। ভয়াবহ নদীভাঙনে এসব পরিবারের অনেকের ঘরবাড়ি ও ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নিঃস্ব হয়ে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। দায়িত্বহীন কর্মকান্ডের জন্য ভাঙ্গণ কবলিত এলাকার মানুষ পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ স্থানীয় প্রশাসনকে দূষছেন। তারা দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
গতকাল সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন দেখা গেছে,নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ্যদের মধ্যে লোহাগড়া ইউনিয়নের ছাগলছিড়া গ্রামের ফায়েক মোল্যা,ছত্তার মোল্যা, ইসলাম ফকির, আলিম মোল্যা, হাই মোল্যা, রসুল মোল্যা এবং কোটাকোল ইউনিয়নের মাকড়াইল,তেলাকাড়া,করগাতি,রায়পাশা গ্রামের মির্জা খাঁ,রেজন খাঁ, রহিমন, খলিল, শাহিন শিকদার, আব্বাস, আকরাম, জাফর খাঁ ও মান্নান মোল্লাসহ আরও অনেক পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী।
লোহাগড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এস,এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেন,ইজারাকৃত বালুমহাল বন্দোবস্তের বাইরে কোন ইজারাদার বালু উত্তোলণ করলে তার ইজারা বাতিলের জন্য জেলা প্রশাসক স্যারকে জানানো হবে। বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার জন্য সহকারি কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ছাগলছিড়া গ্রামের ফায়েক মোল্যা বলেন,নদী ভাঙ্গণে শুধু ২০০ থেকে ২৫০ একর ধানী জমি নদীতে চলে গেছে। রাতের বেলার ভাঙ্গণে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন কিছুই দেখা যায় না। কোথায় যাবো কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারিনা। আমরা গরীব মানুষ। টাকা পয়সাও নেই। যে অন্য জায়গায় সরে গিয়ে ঘর তোলবো।
সুমন মোল্যা বলেন,আমরা লোহাগড়া ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে বসবাস করি। পাশেই গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলা। ভাঙ্গণ রোধে কেউ আমাদের খোজখবর নেয়না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন,অন্য জায়গার ভাঙ্গণে বালির বস্তা ফেলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানে কেউ খবর নেয়না।
গ্রাম পুলিশ নয়ন মোল্যা বলেন,নদী ভাঙ্গণ রোধ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কত স্থানে বালির বস্তা ফেলছে। কিন্তু আমরা বঞ্চিত হয়েছি। তিনি বলেন,একটি মহল নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে বালু কাটা হচ্ছে। যে কারণে বর্ষা এলেই নদীতে ভাঙ্গণ শুরু হয়। তিনি বলেন,কেউ মনে রাখে না নদীর পাড় বালুর তৈরি। একটু আঘাত আনলে সেখানে আস্তে আস্তে ভাঙ্গণ শুরু হয়। তিনি বলেন,বাড়ির পাশের শিক্ষার একমাত্র বাতিঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভাঙ্গণের মুখে পড়েছে ।
আমডাঙ্গা গ্রামের বৃদ্ধা মর্জিনা বেগম বলেন,আমাদের কয়েক বিঘে মাঠাম জমি এই নদী গিলিছে। আগে দুইবার বাড়ি ভাঙ্গিছে। কষ্ট করে নতুন বাড়ি করিছি। নতুন বাড়িও ভাঙ্গার মুখি পড়িছে।
ছাগলছিড়া গ্রামটি লোহাগড়া ইউনিয়নের ৯ নাম্বার ওয়ার্ডভূক্ত। ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা ইউপি সদস্য মো.তাহাজ্জত হোসেন বলেন,মধুমতি নদীর আওতাভূক্ত লোহাগড়া ইউনিয়নের যে কয় স্থানে নদী ভাঙ্গণ শুরু হয়েছে সব স্থানেই ভাঙ্গণরোধে বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে। আমি সংশ্ণিষ্ট দপ্তরে আবেদন করলেও ভাঙ্গণ প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন,নদী ভাঙ্গণে আমার ওয়ার্ডের মানুষরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তিনি সকল মহলের সহযোগিতা কামনা করেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন নিয়ম না মেনে বালু উত্তোলণ করার কারণে নদী তীরবর্তী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে । এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,প্রকল্পের বাইরে আমরা কাজ করতে পারি না। যথাযথ নিয়মেই কাজ করা হয়ে থাকে । তিনি দাবি করেন,নিয়ম বর্হিভূতভাবে বালু উত্তোলণ করার কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ।
মন্তব্য (০)