নিউজ ডেস্ক : পাকিস্তান সিনেটের বিরোধীদলীয় নেতা রাজা নাসির আব্বাস বলেছেন, মক্কা চুক্তিতে আসলে কী কী শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কয়েক ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানে না। দেশটির অঘোষিত শাসক সামরিক বাহিনী হওয়ায় সিদ্ধান্তটি পার্লামেন্টেও তোলা হয়নি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘পাকিস্তান যদি এই যুদ্ধে ঝাঁপ দেয়, তবে তা দেশের জন্য মহাবিপর্যয় নিয়ে আসবে। আমরা ইতোমধ্যে দুটি রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ সামলাচ্ছি; অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী। এই সংঘাতের এক পক্ষে যোগ দিলে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি হবে।’
‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তান’ শীর্ষক শিরোনামে শনিবার দ্য গার্ডিয়ান একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে পাকিস্তানকে না জড়াতে এভাবেই নিজের মতামত তুলে ধরেন রাজা নাসির আব্বাস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে যখন তিনি রিয়াদে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের কাছে বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হচ্ছিল।
সৌদি আরবের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করতে সেখানে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের এই সর্বময় প্রভাবশালী সেনাপ্রধান।
জেনারেল মুনিরের কাছে এটি ছিল বড় ধরনের এক কূটনৈতিক বিজয়। এই চুক্তির ফলে তীব্র অর্থসংকটে ভোগা পাকিস্তান পাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জীবনরক্ষাকারী বিনিয়োগ ও ঋণ। তার বিনিময়ে সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে ইসলামাবাদ। আর সৌদি ভূখণ্ডে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো হামলা হলে দেশটির সুরক্ষায় মাঠে নামবে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, তখন পাকিস্তানের হিসাব-নিকাশ ছিল পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক খুব দ্রুত স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে এবং মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি কম।
তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই হিসাব পুরোটায় উলটে যায়। ফেব্রুয়ারি নাগাদ পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করে এবং জবাবে ইরানও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এর প্রভাবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের থমকে যাওয়া পুরোনো সংঘাত নতুন করে দানা বাঁধতে সময় নেয়নি। তাদের মধ্যবর্তী ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। চলতি মাসের শুরুর দিকে হুথিরা ইয়েমেনে অভূতপূর্ব ভূখণ্ডগত সাফল্য অর্জন করে এবং সৌদি আরবে ড্রোন ও হামলা চালায়। জবাবে সৌদি আরবও ইয়েমেনে জোরালো বিমান হামলা শুরু করেছে। অনেকের মতে, অঞ্চলটিতে আবারো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এই নতুন পরিস্থিতিতে চরম চাপের মুখে পড়েছেন পাকিস্তান ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির। গত আগস্টে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সেই সামরিক চুক্তিতে তুরস্ককে যুক্ত করা হয় এবং এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তিতে নির্ধারণ করা হয়—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা মানে বাকি দুই দেশের ওপরও হামলা বলে গণ্য হবে।
লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘আমার মনে হয় না আসিম মুনির আঞ্চলিক ঝুঁকির মাত্রা সঠিক হিসাব করতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানের সৈন্যদের এত দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে নামাতে হতে পারে, তা তিনি হয়তো ভাবেননি।’
সৌদি আরবের কাছে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম থাকলেও যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত কৌশলী হুথি বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের হুমকি সামলে অভ্যস্ত পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী এই রণক্ষেত্রে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের ধারণা, হুথিদের দমনে সৌদি আরব যদি ‘মক্কা চুক্তি’ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে পাকিস্তানের সামনে সেনা পাঠানো ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না—এমনকি প্রশিক্ষণের কাজে সৌদি আরবে অবস্থানরত হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনাকেও যুদ্ধের ময়দানে নামাতে হতে পারে। কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান এখন সৌদি আরবের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সম্প্রতি দেশটি পাকিস্তানকে জরুরি ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলারের তহবিল ও বিনিয়োগ দিয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তায় তারা ‘অনড়’ ও ‘নিঃশর্ত’ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দেশটির প্রতিরক্ষায় পাকিস্তান ‘যেকোনো সীমা পর্যন্ত’ যেতে প্রস্তুত।
বাহ্যিক মনোভাব কড়া হলেও পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের কর্তাব্যক্তিরা মধ্যপ্রাচ্যের এই অশেষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন। দেশটির অর্থনীতি এমনিতেই ধসে পড়েছে; একই সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে কার্যত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং সীমান্ত এলাকায় তীব্র জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি সামাল দিতে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অনেকের মতে, মক্কা চুক্তি কার্যকর করা মানে ইরানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলি হামলার আগে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল। সেই সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরানকে আলোচনার টেবিলে এনে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইরানের ওপর পাকিস্তান যেমন ক্ষুব্ধ হয়েছে, তেমনি ইসলামাবাদের ওপরও তেহরান বিশ্বাস হারিয়েছে।
বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকার মতে, হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানের যোগদান বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইরানের পর পাকিস্তানেই সবচেয়ে বেশি শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস। ইয়েমেনের হুথিদের ওপর হামলায় পাকিস্তান অংশ নিলে দেশের ভেতরেই বড় ধরনের সুন্নি-শিয়া উত্তেজনার পারদ চড়তে পারে।
তাছাড়া, আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে ইরানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে যুদ্ধে জড়ালে আফগান সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি তালেবানদের সহিংসতা আরও প্রাণঘাতী রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানসংলগ্ন অস্থিতিশীল সীমান্ত অঞ্চল বেলুচিস্তানেও দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন মাত্রা পেতে পারে।
এখন পর্যন্ত এমন কোনো সুনির্দিষ্ট শর্তের কথা স্পষ্ট করা হয়নি যা মক্কা চুক্তিকে সক্রিয় করতে বাধ্য করবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান হয়তো আশা করছে যে, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই বাড়ালেও রিয়াদ সরাসরি ইরানের সঙ্গে উন্মুক্ত যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। চুক্তির অন্য শরিক তুরস্কও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝে পড়তে রাজি নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজ’র পরিচালক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, ‘ইয়েমেনের মাটিতে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপে যুক্ত হওয়া এড়াতে পাকিস্তান তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স নিজেও এখনই চুক্তিটি সক্রিয় করতে চান না।
তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব যদি স্থলবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, পাকিস্তান হয়তো তাদের সহায়তা দেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত ছাড়া সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করবে না। ট্রাম্প প্রশাসন এই মুহূর্তে নতুন কোনো যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলতে আগ্রহী নয়; তারা হুথিদের সঙ্গে আলোচনার পথই খোলা রাখতে চায়।’
তবে তিনি যোগ করেন, ‘ভবিষ্যতে কী হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সত্যিই কঠিন।’
মন্তব্য (০)