• সমগ্র বাংলা

বাংলাদেশে প্রথমবার মিলল সিকাডার নতুন প্রজাতি

  • সমগ্র বাংলা

ছবিঃ সিএনআই

বাকৃবি প্রতিনিধি: সিকাডা বা ঝিঁঝিঁ পোকার একটি প্রজাতি 'ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই বুলার্ড' বাংলাদেশে এই প্রথম পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের গবেষকেরা মাঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ, দৈহিক গঠন বিশ্লেষণ এবং পরিবেশগত তথ্য যাচাই করে প্রজাতিটির পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান এবং চীনের নর্থওয়েস্ট এ অ্যান্ড এফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কং ওয়েই যৌথভাবে গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন। মাঠ পর্যায়ে তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ এবং পোকাটি শনাক্ত করার কাজে সরাসরি অংশ নেন ভারতীয় গবেষক বাবু সাদ্দাম ও বাকৃবির স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শাহমত জাওয়াদ। গবেষণাপত্রটি ছাপা হয়েছে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল 'ইনসেক্টস'-এ।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশের নানা এলাকায় মাঠ জরিপ চালিয়ে মোট ৬৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনাগুলো এখন বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে একটি স্ত্রী ঝিঁঝিঁ পোকা পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি সড়কবাতির নিচে।

জরিপে আম, লিচু, ড্রাগন ফল, পেয়ারা, আনারস, কলা, কাঁঠাল, লেবু ও কমলার বাগানে প্রজাতিটির উপস্থিতি মেলে। এ ছাড়া শাল, বাঁশ, সেগুন ও জারুলসহ নানা গাছ এবং ঝোপঝাড়ে গবেষকেরা পূর্ণবয়স্ক পোকা ও তাদের ফেলে যাওয়া খোলস শনাক্ত করেন।

দৈহিক গঠন বিশ্লেষণে দেখা যায়, 'ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই' সাধারণত ঘাসের মতো সবুজ। জীবিত অবস্থায় এর রং সবুজ থাকে, তবে শুকিয়ে গেলে বাদামি হয়ে যায়। বাইরে থেকে দেখতে 'ডান্ডুবিয়া টার্পসিকোর' প্রজাতির সঙ্গে মিল থাকলেও পুরুষ পোকার দেহের নির্দিষ্ট গঠনই প্রজাতিটিকে আলাদা করে চেনার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি।

এত দিন বাংলাদেশে 'ডান্ডুবিয়া' গণের মধ্যে শুধু 'ডান্ডুবিয়া এনসিফেরা'-র উপস্থিতির তথ্য নথিভুক্ত ছিল। নতুন এই শনাক্তকরণের ফলে দেশের সিকাডা বৈচিত্র্যের তালিকায় আরও একটি প্রজাতি যুক্ত হলো।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান জানান, পোকাটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিস্তার অনুমান করতে তাঁরা 'ম্যাক্সএন্ট' নামের একটি প্রজাতি-বিস্তার মডেল ব্যবহার করেছেন। সংগৃহীত উপস্থিতির তথ্যের সঙ্গে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, ভূমির উচ্চতা ও অন্যান্য পরিবেশগত উপাদান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উপযুক্ত আবাসস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফলাফল বলছে, প্রজাতিটির বিস্তারে সবচেয়ে বড় প্রভাব রাখে বৃষ্টিপাত। বিশেষ করে বছরের উষ্ণ সময়ে বৃষ্টির হেরফের এর বাসযোগ্য এলাকায় পরিবর্তন আনতে পারে। ভূমির উচ্চতা ও তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

গবেষকদের হিসাবে, গবেষণার আওতাভুক্ত এলাকার প্রায় ৮ লাখ ৬১ হাজার বর্গকিলোমিটার বর্তমানে প্রজাতিটির জন্য উপযোগী। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ বর্গকিলোমিটার অত্যন্ত উপযোগী এবং ১ লাখ ৭৯ হাজার বর্গকিলোমিটার মাঝারি উপযোগী।

জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য দৃশ্যকল্প বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা তুলনামূলক কম বাড়লে ২০৬০ সালের মধ্যে উপযোগী আবাসস্থল বেড়ে প্রায় ১৭ লাখ ৫২ হাজার বর্গকিলোমিটারে পৌঁছাতে পারে। শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা আরও বেড়ে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটার হতে পারে।

বিপরীতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা অনেক বেশি বাড়লে শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উপযোগী আবাসস্থল সাময়িকভাবে কমে আসার আশঙ্কা আছে। তবে পরে তা দ্রুত বেড়ে ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ২৬ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটারে দাঁড়াতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলালে পোকামাকড়ের ভৌগোলিক বিস্তারও বদলে যেতে পারে। তবে ম্যাক্সএন্ট মডেলে দেখানো আবাসস্থলের সম্প্রসারণ কেবল সম্ভাব্য পরিবেশগত উপযোগিতার পূর্বাভাস। এটি ঝিঁঝিঁ পোকার প্রকৃত বিস্তার বা কৃষির ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চিত চিত্র নয়।

অপরিণত অবস্থায় ঝিঁঝিঁ পোকা মূলত উদ্ভিদের জাইলেম, অর্থাৎ পানি ও খনিজ পরিবহনকারী কলার রস খেয়ে বেঁচে থাকে। বিভিন্ন প্রজাতির সিকাডা গাছ ও ফসলের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে নতুন শনাক্ত হওয়া 'ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই' বর্তমানে কৃষিতে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা এই গবেষণায় নির্ণয় করা হয়নি। তাই আবাসস্থল বাড়ার পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কার কথা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান বলেন, দেশের বিভিন্ন ফলবাগানে সিকাডার উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মে আম পাকার সময় গাছের আশপাশে এদের প্রজননকালীন তীব্র ডাক শোনা যায়, যা থেকে আমবাগানে এদের উপস্থিতির আভাস মেলে।

তিনি জানান, দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে নানা ফলের চাষ বাড়ছে। ম্যাক্সএন্ট মডেল অনুযায়ী এসব অঞ্চলের কিছু অংশ পোকাটির সম্ভাব্য বিস্তারের আওতায় পড়ে। কিন্তু সেখানকার বাণিজ্যিক ফলবাগানে এর কী প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের উৎপাদন ও গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়নি।

অধ্যাপক মঞ্জুর খান বলেন, শুধু নতুন প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; এর বিস্তার, জীবনচক্র, খাদ্যাভ্যাস এবং কৃষিতে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ণয় করাও জরুরি। পোকাটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হলে কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য কৃষিঝুঁকি যাচাইয়ে দীর্ঘমেয়াদি মাঠ গবেষণা অপরিহার্য। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের বাণিজ্যিক ফলবাগানে প্রজাতিটির উপস্থিতি, ক্ষতির পরিমাণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়নকারী সংস্থার সহযোগিতা দরকার।

গবেষকদের মতে, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত গবেষণা সহায়তা পেলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রজাতিটির পরিবেশগত বিস্তার ও কৃষিতে প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। এতে ভবিষ্যতে কোনো অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি ধরা পড়লে সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

মন্তব্য (০)





image

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বে বিরল নজির বাংলাদেশ: ভারপ্...

১

দিনাজপুর প্রতিনিধি: বিজিবি'র রংপুর রিজিয়নের ভারপ্রা...

image

বেনাপোলে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ যুবক আটক

২

বেনাপোল প্রতিনিধি: যশোরের বেনাপোলে মুরগিবাহী একটি ভ্যান থেকে...

image

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে রিসোর্টে আগুন, ৭ জন নিহত

৩

কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে &...

image

জীবননগরে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন করলেন ৫৮ বিজিবি অধিনায়ক

৪

​চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে ঝিন...

image

পঞ্চগড়ে ১৬টি মন্দিরে দেড় কোটি টাকার অনুদান দিলেন প্রতিমন...

৫

পঞ্চগড় প্রতিনিধি:পঞ্চগড়ের বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা এবং ...

  • company_logo