গাজীপুর প্রতিনিধি : সপ্তাহজুড়ে কেউ ব্যস্ত স্কুল-কলেজে, কেউ চাকরিতে, আবার কেউ ছোটখাটো ব্যবসায়। কিন্তু শুক্রবার সকাল হলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। হাতে দা, কোদাল, ঝাড়ু আর আগাছা পরিষ্কারের সরঞ্জাম নিয়ে গ্রামের কিশোর, তরুণ ও যুবকেরা একত্রিত হন সামাজিক একটি কাজে। উদ্দেশ্য একটাই-নিজেদের গ্রামের কবরস্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার কালীগঞ্জ পৌর এলাকার ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামের তরুণদের এমন উদ্যোগ এখন এলাকায় প্রশংসার বিষয় হয়ে উঠেছে। কয়েক মাস পরপরই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামাজিক কবরস্থান পরিষ্কার অভিযানে অংশ নেন। আগের দিন থেকেই মেসেঞ্জার গ্রুপ “কবরস্থান কমিটির সদস্যবৃন্দ”-এ বার্তা পৌঁছে যায় সবার কাছে। এরপর শুক্রবার সকালেই শুরু হয় তাদের সম্মিলিত কার্যক্রম।
গ্রামের মদিনাতুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সামনে অবস্থিত এই সামাজিক কবরস্থানকে নিজেদের দায়িত্বের জায়গা বলেই মনে করেন তারা। কারণ এখানে শায়িত আছেন তাদের বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানীসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জন।
তরুণদের ভাষ্য, কবরস্থান শুধু মৃতদের জায়গা নয়, এটি একটি গ্রামের ইতিহাস ও আবেগের অংশ। তাই আগাছায় ভরে গেলে কিংবা পরিবেশ নোংরা হলে তা পরিষ্কার রাখা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
শুধু কবরস্থান পরিষ্কার নয়, গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক কাজেও এগিয়ে আসে এই তরুণ সমাজ। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় প্রায় তিন হাজার মুসল্লির জন্য ঈদগাহ মাঠ প্রস্তুত করা, মাদক ও জুয়া বিরোধী সচেতনতা তৈরি এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণও তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।
পথচারী তুমলিয়া ইউনিয়নের উত্তর সোম গ্রামের খলিল মিয়া বলেন, “বর্তমান সময়ে তরুণদের নিয়ে মানুষ নানা অভিযোগ করে। কিন্তু এই গ্রামের ছেলেদের কাজ দেখে সত্যিই ভালো লাগে। তারা সমাজের জন্য কাজ করছে, এটা অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা।”
এই কার্যক্রমের সমন্বয় করেন গ্রামের তরুণ মাহফুজুর রহমান ইমন। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও শুক্রবারের ছুটির দিনটিকে তিনি সামাজিক কাজের জন্যই রাখেন।
ইমন বলেন, “আমরা চাই গ্রামের তরুণরা ভালো কাজে যুক্ত থাকুক। আমাদের পূর্বপুরুষরা এই কবরস্থানে শায়িত আছেন। তাই এটি পরিষ্কার রাখা আমাদের দায়িত্ব। পাশাপাশি ছোটদের মধ্যেও সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে আমরা সবাই মিলে কাজ করছি।”
সামাজিক কবরস্থান কমিটির সভাপতি আল আমিন সুমন বলেন, “কোনো ধরনের চাপ ছাড়াই গ্রামের তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব কাজে অংশ নেয়। তাদের এই ঐক্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
মদিনাতুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি ইনজামুল হক জাকির বলেন, “তরুণদের এমন ইতিবাচক কর্মকাণ্ড সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে না, বরং সমাজে মানবিক মূল্যবোধও ছড়িয়ে দিচ্ছে।”
ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি মো. রফিজ উদ্দিন বলেন, “এই ছেলেদের কারণে গ্রামের পরিবেশ সুন্দর থাকছে। তারা সামাজিক সম্প্রীতি ও সচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”
গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি মো. মানিক মিয়া ফালু মুন্সি বলেন, “এখনকার সময়ে তরুণদের এমন উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়। গ্রামের ছেলেরা যেভাবে একসাথে সামাজিক কাজে অংশ নিচ্ছে, তা সত্যিই গর্বের বিষয়।”
ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব এবং মদিনাতুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মুহতামিম মুফতি আরিফুল ইসলাম বলেন, “ইসলামে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে। কবরস্থান পরিষ্কার রাখা ও সমাজের কল্যাণে কাজ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তরুণদের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।”
স্থানীয়দের মতে, প্রযুক্তির এই সময়ে যখন অনেক তরুণ মোবাইল আর ভার্চুয়াল জগতে ব্যস্ত, তখন ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামের কিশোর-তরুণরা বাস্তব সামাজিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে।
মন্তব্য (০)