• সমগ্র বাংলা

ফুল ফোটার অপেক্ষা ছিল, শেষ হলো কাটা গুঁড়িতে

  • সমগ্র বাংলা

ছবিঃ সিএনআই

গাজীপুর প্রতিনিধি : কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলে সড়কের পাশটা একদিন বদলে যাবে-এমন একটি ছোট্ট স্বপ্ন ছিল মাসুদ পারভেজের। স্বপ্নটি নিজের জন্য নয়, পথচলা মানুষের জন্য।

চার বছর আগে যে গাছগুলো তিনি মাটিতে পুঁতেছিলেন, তখন সেগুলো ছিল একেবারেই ছোট। নিজের বেতনের টাকা খরচ করে স্থানীয় একটি নার্সারি থেকে কিনেছিলেন ১০টি কৃষ্ণচূড়াসহ বনজ ও ফলজ গাছ। গাজীপুরের কালীগঞ্জ-ঘোড়াশাল আঞ্চলিক সড়কের ঘোড়াশাল সেতুতে ওঠার আগের চত্বরের পশ্চিম পাশে সেগুলো লাগিয়েছিলেন।তারপর শুরু হয় অপেক্ষা।

প্রতিদিন নয়, তবু নিয়মিত গাছগুলোর খোঁজ নিতেন মাসুদ। পানি দিতেন, আগাছা পরিষ্কার করতেন। ঋতু বদলেছে, গাছের ডালপালা বেড়েছে, কচি চারাগুলো ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

চার বছর পর কৃষ্ণচূড়াগুলো আর চারা নেই। বেশ বড় হয়েছে। মাসুদের অপেক্ষাও তখন শেষ হওয়ার পথে-শুধু ফুল ফোটার অপেক্ষা।

কিন্তু বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে সেই গাছগুলোকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন, বিকেলে গিয়ে আর সেভাবে পাননি। ৩-৪টি বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ কেটে নিয়ে গেছে কে বা কারা। পড়ে আছে কেবল কাটা গুঁড়ি।

চার বছরের যত্নের পর ফুল ফোটার ঠিক আগমুহূর্তে যেন গল্পটির মাঝপথেই ইতি টেনে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা জানান মাসুদ পারভেজ।

‘নিজের বেতনের টাকা দিয়ে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই গাছগুলো লাগিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম একদিন বড় হবে, ফুল ফুটবে, মানুষ ছায়া পাবে। এখন বড় হয়ে ওঠা গাছগুলো কেটে ফেলে নিয়ে যাওয়ায় আমার এত কষ্ট লাগছে যে, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। যে বা যারা এই কাজ করেছে, আল্লাহ তাআলা তাদের হেদায়েত দান করুন।’

মাসুদ পারভেজ জাতীয় মহিলা সংস্থা, কালীগঞ্জ উপজেলা শাখা কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর। স্থানীয়দের ভাষ্য, গাছগুলো লাগানোর পরও তিনি নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যা করতেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রিফাত বলেন, ‘গাছগুলো যখন ছোট ছিল, তখন হয়তো অনেকেই গুরুত্ব দেয়নি। কয়েক বছরে সেগুলো বড় হয়ে সুন্দর হয়ে উঠেছিল। কৃষ্ণচূড়ায় ফুল এলে জায়গাটি আরও সুন্দর লাগত। গাছ কেটে নেওয়ায় পরিবেশেরও ক্ষতি হয়েছে।’

আঞ্চলিক সড়কের পাশের হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুল বাতেনের চোখেও ঘটনাটি শুধু কয়েকটি গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনা নয়।

তিনি বলেন, ‘কেউ নিজের টাকা খরচ করে গাছ লাগালে সেটি রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। এগুলো কারও ব্যক্তিগত সম্পদ না হলেও সবার উপকারে আসে। যারা কেটেছে, তাদের খুঁজে বের করা দরকার।’

কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি অ্যাডভোকেট মু. আতিকুর রহমান ভূঞা বলেন, ‘একটি গাছ শুধু কাঠ নয়। বড় হতে সময় লাগে, ছায়া দেয়, বাতাস শোধন করে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে লাগানো এসব গাছ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।’

বিষয়টি নিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সড়কের পাশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ লাগানো একটি ভালো ও পরিবেশবান্ধব কাজ। গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে গাছ কাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মাসুদ পারভেজের চাওয়া খুব বড় কিছু ছিল না। সড়কের পাশে একটু সবুজ, পথচারীর জন্য একটু ছায়া আর ঋতুর এক সকালে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল।

চার বছর ধরে সেই স্বপ্নকে বড় হতে দেখেছেন তিনি। গাছগুলোও প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল কাঙ্ক্ষিত সেই সময়ের কাছে।

কিন্তু ফুল ফোটার আগেই কেউ কেটে দিল সেই অপেক্ষা।

এখন সেখানে কৃষ্ণচূড়ার ছায়া নেই, নেই লাল ফুলের সম্ভাবনাও। আছে কয়েকটি কাটা গুঁড়ি-আর সেগুলোর পাশে পড়ে থাকা একজন গাছপ্রেমী মানুষের চার বছরের নীরব স্বপ্নের গল্প।

মন্তব্য (০)





  • company_logo