নিউজ ডেস্ক : লেবাননে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে এবং ইসরাইলের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকরের লক্ষ্যে হিজবুল্লাহর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বৈরুতের শহরতলিতে ইসরাইলি বাহিনীর নতুন করে জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশের পর সোমবার (১ জুন) তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান।
ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে জানান, উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর সঙ্গে তার খুব ভালো ফোনালাপ হয়েছে এবং উভয় পক্ষ সব ধরনের গোলাগুলি বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইল হিজবুল্লাহর ওপর আর কোনো হামলা চালাবে না এবং হিজবুল্লাহও ইসরাইলে আক্রমণ করবে না।
একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও একটি ফলপ্রসূ আলোচনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, বৈরুতে কোনো মার্কিন সেনা পাঠানো হবে না এবং যেসব সেনা সেখানে যাওয়ার পথে ছিল, তাদের ইতোমধ্যেই ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এই আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হোয়াইট হাউজের প্রেস অফিসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের বাইরে অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এদিকে ট্রাম্পের এই বার্তার পর লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ সমগ্র লেবানন জুড়ে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি’ সমর্থন করে, যা পরবর্তীতে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের পথ সুগম করবে।
তবে বৈরুতে হামলা বন্ধের বিনিময়ে উত্তর ইসরাইলে হিজবুল্লাহর আক্রমণ বন্ধ করার মতো কোনো আংশিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তারা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্সিও নিশ্চিত করেছে যে হিজবুল্লাহ সমগ্র লেবাননে ‘পারস্পরিক হামলা বন্ধের’ একটি মার্কিন প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও লেবাননের ইতিবাচক সুরের বিপরীতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহু বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে হিজবুল্লাহ যদি ইসরাইলের শহর ও নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ না করে, তবে ইসরাইলি বাহিনী বৈরুতের সন্ত্রাসী আস্তানায় হামলা চালিয়ে যাবে।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে ইসরাইলের এই অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং এর পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের পূর্বপরিকল্পিত অভিযান অব্যাহত রাখবে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরাইল কাৎজও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হিজবুল্লাহর হামলা চলতে থাকলে বৈরুতে কোনো শান্তি থাকবে না। এই হুমকির মুখে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দারা নতুন করে বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছেন।
অন্যদিকে, ইরান চলমান মার্কিন আলোচনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে বলে গুঞ্জন উঠলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প তা নাকচ করে দিয়েছেন। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লেবাননে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান হামলার কারণে ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে সব ধরনের আলোচনা স্থগিত করেছে।
ইরান মূলত গাজা ও লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের অবসান চায় এবং দাবি আদায় না হলে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাত নিরসনে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি ইসরাইল ও লেবাননের সামরিক প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠক করেছেন।
এছাড়াও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের স্থলাভিষিক্ত হওয়া বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে সরাসরি বৈঠক করেছেন, যা গত চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মুখোমুখি আলোচনা। হিজবুল্লাহকে ওয়াশিংটন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে গণ্য করলেও লেবাননের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাদের বাদ দিয়ে যেকোনো স্থায়ী সমাধান যে কঠিন, তা ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক ফোনালাপের দাবি থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।
মন্তব্য (০)