• আন্তর্জাতিক

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্নের অভিযোগে পাকিস্তানের চতুর্থ বিচারপতির পদত্যাগ, বললেন ‘বিবেক সায় দিচ্ছে না’

  • আন্তর্জাতিক

ছবিঃ সংগৃহীত

নিউজ ডেস্কঃ  পাকিস্তানের হাইকোর্টের অন্যতম বিশিষ্ট বিচারপতি মোহসিন কায়ানি বুধবার বিচারকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি পদত্যাগের কারণ হিসেবে ‘বিবেকের তাড়না’র কথা উল্লেখ করেছেন।

এপ্রিল থেকে লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কায়ানি বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীর পর পদত্যাগ করা চতুর্থ বিচারপতি। এর আগে একই ধরনের কারণ দেখিয়ে গত বছরের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মনসুর আলী শাহ ও আতহার মিনাল্লাহ এবং লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি শামস মাহমুদ মির্জা পদত্যাগ করেন।

বিচার বিভাগের ওপর সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সমালোচনা করে পদত্যাগপত্রে কায়ানি বলেন, পাকিস্তানের ২৬তম ও ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আনা পরিবর্তনগুলো বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতাকে ক্ষুণ্ন করেছে’।

পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, ‘আমি বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ প্রত্যক্ষ করেছি। বিচারপতিদের নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রেও এই নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হয়েছে। আমার মূল্যায়নে, এ ধরনের হস্তক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতার ওপর জনগণের আস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষয় করেছে।’

সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কায়ানি। তিনি বলেন, যাদের সেবা দেওয়ার জন্য বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, সেই সাধারণ মানুষের প্রয়োজনই প্রায়ই উপেক্ষিত হয়েছে।

তিনি লেখেন, ‘এ পরিস্থিতিতে বিচারকের আসনে থেকে যাওয়ার অনুমতি আমার বিবেক আমাকে দেয় না।’ তিনি জানান, আইন পেশায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সেখানে তিনি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আইনি সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ চালিয়ে যেতে চান।

পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এল, যখন ১০ ফেব্রুয়ারি ২০৩২ সালে তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত অবসরের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আগে তিনি পদত্যাগ করলেন। বিচারপতিদের বদলি এবং পাকিস্তানের হাইকোর্টগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের পর এ ঘটনা ঘটল।

নির্বাহী বিভাগ বনাম বিচার বিভাগ

২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন কায়ানি। ২৯ এপ্রিল তাঁকে লাহোর হাইকোর্টে বদলি করা হয়। এতে ওই আদালতের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তাঁর অবস্থান নেমে আসে ১২ নম্বরে। তাঁকে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

লাহোর হাইকোর্ট থেকে বিচারপতি সরদার মুহাম্মদ সরফরাজ দোগরকে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সেই সম্ভাবনা জটিল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সিন্ধু ও বেলুচিস্তান হাইকোর্টের আরও দুই বিচারপতিকেও বদলি করা হয়।

কায়ানি ও অন্যান্য বিচারপতি আন্তঃহাইকোর্ট বদলির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেন। সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ দোগরসহ বিচারপতিদের বদলি বহাল রাখেন। তবে ডন–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের ক্ষমতা এবং বিচারিক বেঞ্চ গঠনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৃহত্তর বিরোধের অংশ হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে কায়ানি ও ইসলামাবাদ হাইকোর্টের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ বিচারপতি প্রধান বিচারপতি দোগরের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁদের অভিযোগ, আদালতের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ‘এককেন্দ্রিক শাসনে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রধান বিচারপতি নিজের বিবেচনায় বিচারকদের মামলা শুনানি থেকে বাদ দিতে পারেন।

লাহোর হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হওয়া সত্ত্বেও কায়ানিকে কোনো ডিভিশন বেঞ্চে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। পদত্যাগের কয়েক দিন আগে আদালতের বেঞ্চ পুনর্বিন্যাসের পর তিনি ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডি এলাকায় ফিরে যান। সেখানে হাইকোর্টের রাওয়ালপিন্ডি রেজিস্ট্রিতে একক বিচারপতির বেঞ্চে সভাপতিত্ব করেন তিনি। নতুন বেঞ্চ বিন্যাসে তাঁকে সেখানে শুধু একক বিচারপতির বেঞ্চেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ নিয়ে সরব বিচারপতি

বিচার বিভাগে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের বিষয়ে বরাবরই সরব ছিলেন কায়ানি। ২০২৪ সালের মার্চে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলা ইসলামাবাদ হাইকোর্টের ছয় বিচারপতির একজন ছিলেন তিনি।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সদস্যদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিচারপতিরা তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টির বিভিন্ন কথিত প্রচেষ্টার বিবরণ দেন। এর মধ্যে ছিল তাঁদের স্বজনদের অপহরণ ও নির্যাতন এবং বাড়ির ভেতরে গোপনে নজরদারি চালানোর অভিযোগ।

জোরপূর্বক গুমের মতো দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিষয় নিয়ে মামলাও পরিচালনা করেছেন কায়ানি। লাহোর হাইকোর্টের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় আরও কঠোর শাস্তিসহ বিভিন্ন আইনি সংস্কারের পক্ষে ছিলেন তিনি।

বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে ইসলামাবাদের আইনজীবী মহলে নেতৃত্বের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন কায়ানি। তিনি ইসলামাবাদ জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক এবং পরে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইসলামাবাদ হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

২০২৪ সালের অক্টোবরে পাস হওয়া ২৬তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টগুলোর ক্ষমতা সীমিত করা হয়। সংশোধনীর ফলে সুপ্রিম কোর্টের নিজ উদ্যোগে কোনো বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা বাতিল হয়। পাশাপাশি, প্রচলিত জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক পদ্ধতি থেকে সরে এসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে শীর্ষ তিন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি (সিজেপি) নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনী একটি ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত (এফসিসি) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। প্রস্তাবিত এই আদালতের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাগুলো সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকত, আর সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জগুলো নতুন আদালতে স্থানান্তর করা হতো।

তবে ওই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। এর পরিবর্তে সমঝোতার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টগুলোতে পৃথক সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে পাকিস্তানে দুটি সমান্তরাল সর্বোচ্চ আদালত রয়েছে, যার প্রতিটির নেতৃত্বে রয়েছেন আলাদা প্রধান বিচারপতি। আদালত দুটি হলো সুপ্রিম কোর্ট ও ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত।

২০২৫ সালের নভেম্বরে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী পাস হওয়ার পরপরই কায়ানি ও সামান রাফাত ইমতিয়াজ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তাঁরা হয়তো আর দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন না।

পদত্যাগপত্রে কায়ানি লেখেন, ‘এ পরিস্থিতিতে বিচারকের আসনে থেকে যাওয়ার অনুমতি আমার বিবেক আমাকে দেয় না। এটি একটি বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত। তবে এর মাধ্যমে আমার সেই বিশ্বাসই প্রতিফলিত হয়েছে যে বিচারিক পদ কখনোই স্বাধীনতা, সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না।’

তিনি আরও লেখেন, ‘তাই আমি মনে করি, বিচারকের পোশাক খুলে রেখে আইন পেশায় ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে। এর মাধ্যমে আমি জনগণের সেবা করা, তাদের অধিকার রক্ষা এবং আইনি সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

মন্তব্য (০)





image

ইসরাইলে ফিলিস্তিনি নাগরিক, কারা তারা? কী ধরনের নিপীড়ন সইত...

১

নিউজ ডেস্ক : ইসরাইলে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশ ফিলিস্ত...

image

নির্বাচনে আরব দলগুলোর বড় সাফল্যের পর নেতাদের গ্রেফতারের দ...

২

নিউজ ডেস্ক : ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ...

image

নেতানিয়াহুকে হটাতে বিরোধী জোটের সঙ্গে হাত মেলানোর ইঙ্গিত ...

৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :  ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারক...

image

চীনে ‘এআই বুদ্‌বুদ ইতোমধ্যে ফেটে গেছে’, চার মাসে শেয়ারের ...

৪

নিউজ ডেস্কঃ  মানবজাতির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক...

image

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করলেন খা...

৫

নিউজ ডেস্কঃ  ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল...

  • company_logo