গাজীপুর প্রতিনিধি : একই দিনে দুই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ। প্রথমে একটি গেস্ট হাউস, কয়েক ঘণ্টা পর রেলওয়ে স্টেশনের পরিত্যক্ত স্টাফ কোয়ার্টার। অভিযোগ, দুই জায়গাতেই এক তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনায় মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়েছে ভিডিও। এরপর সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
১০ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের কালীগঞ্জে জাহিদ মুন্সি (২৬) নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগীর স্বজনের লিখিত অভিযোগের পর সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কালীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি শুধু পুলিশের তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাহিদ মুন্সি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কালীগঞ্জ উপজেলা শাখার যুগ্ম সদস্য সচিব হওয়ায় দলীয় পর্যায়েও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব সাংগঠনিক দায়িত্ব ও পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে কলেজে যাওয়ার পর জাহিদ ওই তরুণীকে গাজীপুর মহানগরীর পূবাইলের মিরের বাজার এলাকার একটি গেস্ট হাউসে নিয়ে যান। সেখানে তরুণীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ।
পরে বিকেলে তাকে কালীগঞ্জ সরকারি শ্রমিক কলেজের অনার্স ভবনের পেছনে আড়িখোলা রেলওয়ে স্টেশনের পরিত্যক্ত স্টাফ কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে আবারও জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। এ সময় ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর বিয়ের জন্য চাপ দিলে ওই তরুণীকে ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগপত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, জাহিদ ও ওই তরুণীর পরিচয় হয় প্রায় তিন-চার মাস আগে। তরুণীর বোন কালীগঞ্জের একটি শপিং কমপ্লেক্সে জাহিদের দোকানে ঘড়ি কিনতে গেলে তাদের পরিচয় হয়।
পরবর্তীতে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে জাহিদের সঙ্গে ওই তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, সম্পর্কের সময় বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পরে তরুণী শারীরিক সম্পর্কে রাজি না হলে প্রযুক্তির মাধ্যমে তার মুখমণ্ডল বিভিন্ন অশ্লীল ছবিতে যুক্ত করে ভয় দেখানোর অভিযোগ ওঠে।
এরপর এসব ছবি ও ভিডিও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবারই তরুণী বিয়ের জন্য চাপ দিলেও জাহিদ বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতেন বলে অভিযোগকারীর ভাষ্য।
বিষয়টি পরিবারকে জানানোর পর স্বজনরা জাহিদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে জাহিদের আগে একাধিক বিয়ে করার তথ্য জানতে পারেন বলে দাবি করেছেন তারা। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব তথ্য গোপন রেখেই তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছিল।
জাহিদ মুন্সি ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
জাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর এনসিপি গাজীপুর জেলা শাখা তাকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়।
দলীয় নোটিশে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে দলীয় নীতি, আদর্শ ও নৈতিকতার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাজীপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক এম এম শোয়াইব ও সদস্য সচিব খন্দকার আল আমিনের নির্দেশক্রমে তাকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব সাংগঠনিক দায়িত্ব ও পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন এনসিপি গাজীপুর জেলা শাখার জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক (দপ্তর) রফিকুল ইসলাম রায়হান।
গাজীপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক এম এম শোয়াইব বলেন, গঠনতন্ত্র ও শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী জাহিদের বিরুদ্ধে কেন চূড়ান্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে লিখিত আত্মপক্ষ সমর্থন, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও ব্যাখ্যা দুই কার্যদিবসের মধ্যে শৃঙ্খলা কমিটির কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জাহিদ মুন্সির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন।
ওসি মো. জাকির হোসেন বলেন, “মামলা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা, ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।”
একটি ঘড়ির দোকানে পরিচয় থেকে যে সম্পর্কের শুরু, চার মাসের ব্যবধানে সেটিই এখন ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে মামলায় গড়িয়েছে। অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রকৃত ধারাবাহিকতা এবং এর পেছনের বাস্তবতা এখন পুলিশের তদন্তেই নির্ধারিত হবে।
মন্তব্য (০)