নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা সদরের অদূরে অবস্থিত এক সময়ের সুনামধন্য বিদ্যাপিঠটি হচ্ছে চকমনু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু বিগত প্রায় ১৫বছর যাবত বিদ্যালয়টির শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আর দলাদলির কারণে প্রতিবছরই কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে স্কুলটির সুষ্ঠ ও সুন্দর পাঠদানের পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এমন দ্বন্দ্ব সমাধানে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও।
স্কুল সূত্রে জানা গেছে ২০২৩ সালে স্কুলটিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো ১১৩জন, ২০২৪ সালে ৯৯জন, ২০২৫সালে ৯৮জন ও ২০২৬সালে ৮১জন। বর্তমানে বিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা কাগজে-কলমে ৮১জন থাকলেও প্রতিদিন গড়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে ৫০-৬০জন শিক্ষার্থী। আর এই ক’জন শিক্ষার্থীদের জন্য ওই বিদ্যালয়ে রয়েছেন ৬জন মহিলা শিক্ষক। বর্তমানে স্কুলটির জরাজীর্ণ অবস্থা। শুধু চকমনু স্কুলই নয় উপজেলার আরো কয়েকটি স্কুলেরও একই অবস্থা।
সম্প্রতি শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করায় একাধিক লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে একজন সহকারি শিক্ষককে ডেপুটেশনে পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রধান শিক্ষক ও তার পছন্দের একজন সহকারি শিক্ষক মিলে একদল এবং অন্যান্য সহকারি শিক্ষক মিলে একদল তৈরি হওয়ার কারণে প্রতিদিনই দুই দলের মাঝে বিভিন্ন ছোট ছোট বিষয়ে ঝগড়া, কথা কাটাকাটি ও গালমন্দ করার ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকছে। এতে করে মাঝে মধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দাদের এসে শিক্ষকদের মধ্যে হওয়া কোন্দল সমাধান করতে হচ্ছে ফলে স্কুলটি থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায় অনেক বড় কোন্দলের পর ২০১৮সালে বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মোছা: জেবুন নেছা। এরপর থেকে তিনি তার পছন্দের একজন সহকারি শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ের কর্মকান্ড পরিচালনা করতে শুরু করেন। আর বাকি সহকারি শিক্ষকদের ভুল ও অবহেলাজনিত এবং কোন কারণ ছাড়াই হয়রানী করা, কথায় কথায় ভুল ধরাসহ মন্দ আচরণ শুরু করেন। এতে করে অন্যান্য সহকারি শিক্ষকদের মাঝে আস্তে আস্তে দানা বাধতে থাকে কোন্দল। এতে করে সহকারি শিক্ষকরাও প্রধান শিক্ষক ও তার দলের অপর শিক্ষককে প্রতিপক্ষ মনে করায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব জটিল হতে থাকে। এমতাবস্থা থেকে মুক্ত হতে পুরো স্কুলটির সকল কর্মকান্ড সংশ্লিষ্টরা পর্যবেক্ষণ করার জন্য সিসিটিভির আওতায় আনেন। এরপর থেকে কোন্দল আরো গভীর হতে থাকে। মাঝে মধ্যে কথাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতিরও ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে গত কোরবানীর ইদের পর থেকে যখন প্রধান শিক্ষক সহকারি শিক্ষকদের সঙ্গে আনা শিশুকে দুধ খাওয়ানো, অন্যান্য কর্মকান্ড মোবাইল ফোন দিয়ে রেকর্ড ও ভিডিও করতে শুরু করেন তখন থেকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো আরো প্রকট আকার ধারন করতে শুরু করেছে। বর্তমানে স্কুলটির শিক্ষকরা স্কুলটিতে আসেন সময় পার করার জন্য আর মাস শেষে সরকারের বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক মোছা: সাথী আক্তার জানান বর্তমানে স্কুলটির ছয় শিক্ষকের মধ্যে কোন মিলমিশ নেই। প্রধান শিক্ষক ও এক সহকারি শিক্ষক মিলে এক দল আর অপর শিক্ষকরা এক দল। তাদের আচার-আচরনে মনে হয় প্রতিটি শিক্ষক একে অপরের সতীন। তাহলে ওই শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কি শিক্ষা গ্রহণ করবে। শিক্ষকরা একে অপরের দোষত্রুটি খুজে বের করে ঝগড়া করবেন নাকি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতাসহ পাঠদান করাবেন। মাঝখান থেকে স্থানীয় গরীব অভিভাবকরা পড়েছে বিপদে। সামর্থ থাকলে আমার সন্তানকেও প্রাইভেট স্কুলে পড়াতাম।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক মো: জুয়েল সরদার জানান স্কুলটি বর্তমানে তাদের গ্রামের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আজ স্কুলটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বছরের পর বছর গ্রামবাসীরা চেস্টা করেও সুন্দর একটি পরিবেশ এখন পর্যন্ত স্কুলে আনতে পারেনি। এটি আমাদের সকলের ব্যর্থতা। আমরা যারা গরীব ও খেটে খাওয়া মানুষ তারাই শুধু স্কুলে সন্তানদের দিয়ে রেখেছি। এতে করে শিক্ষকদের কারণে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যদি স্কুলটির সকল নারী শিক্ষকদের পরিবর্তন করে শুধুমাত্র পুরুষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যেতো তাহলে হয়তোবা পরিবর্তন আসলেও আসতে পারে। তাই স্কুলটি বেঁচে রাখতে দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
আরেক বাসিন্দা ও অভিভাবক শফিকুল ইসলাম জানান বর্তমানে নিম্ম আয়ের মানুষ ছাড়া অন্য কোন মানুষরা স্কুলটিতে তাদের সন্তানদের পড়ালেখার জন্য পাঠায় না। এমনকি ওই স্কুলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও শিক্ষকদের এই নোংরা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে নিজের সন্তানদের প্রাইভেট স্কুলে পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এমন নোংরা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে স্কুলটির পাঠদানের সুষ্ঠ ও সুন্দর পরিবেশ।
স্কুলের অন্য সহকারি শিক্ষকরা জানান প্রধান শিক্ষক শুধুমাত্র মেরিনা ম্যাডামকে সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে আসছেন। আর আমাদের সামান্য কিছুতেই প্রধান শিক্ষক তুলকালাম করে ফেলেন। আমরা যারা সহকারি শিক্ষক আছি প্রধান শিক্ষক আমাদের চোখের বালি মনে করেন। যার কারণে প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকছে। আমরাও প্রধান শিক্ষককে যথাযথ সম্মান দেখিয়ে স্কুলে যার যার দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালনের চেস্টা করলেও প্রধান শিক্ষকের চোখে তা খারাপ। আমরা সহকারি শিক্ষকরাও পড়ে গেছি মহাবিপদে। আমরাও এমন সমস্যার সঠিক সমাধান কামনা করছি।
প্রধান শিক্ষক মোছা: জেবুন নেছা জানান সহকারি শিক্ষকদের যখনই তাদের অনিয়ম কিংবা অন্য কোন বিষয়ে ভুল ধরিয়ে দিলেই তিনি তাদেও কাছে খারাপ হয়ে যান। স্কুলের সার্বিক পরিবেশ পর্যবেক্ষন করার জন্য কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা নিয়েও সহকারি শিক্ষকরা তার সঙ্গে খারাপ আচরন অব্যাহত রেখেছেন। মাঝে মধ্যে শিক্ষকরা নিজের একাধিক ছোট সন্তানদের স্কুলে আনেন এবং পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রেখে শুধুমাত্র সন্তানদের দেখভাল করেন। এই বিষয়গুলো বলতে গেলে, দেরি করে স্কুলে না আসতে বলাসহ কোন বিষয়ে তাদেরকে পরামর্শ কিংবা প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্দেশ দিতে গেলেই তারা আমাকেও নানা ধরণের খারাপ আচরণ করাসহ মন্দ ভাষায় কথা বলেন। পরিবেশ ভালো করতে না পারাসহ নানা কারণে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষরা আমাকে দোষারোপ করেন। তাহলে আমি একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে কোথায় যাবো?
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোছা: রেবেকা সুলতানা জানান ওই স্কুলটি নিয়ে আমরা কর্তৃপক্ষরাও চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। ইতোমধ্যেই এক শিক্ষককে ওই স্কুল থেকে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছে। দ্রুতই স্কুলটিতে একটি সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ পাঠদানের পরিবেশ বিনির্মাণ করতে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা জানান এই কর্মকর্তা।
মন্তব্য (০)