নিউজ ডেস্ক : অটোইমিউন কন্ডিশন বা রোগ নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন প্রতিনিয়ত সতর্কতা। বিশেষ করে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রতিদিনের জীবন মানেই রক্ত পরীক্ষা করার জন্য আঙুল ফোটানো, কঠোরভাবে কার্বোহাইড্রেট গণনা করা এবং দিনে একাধিকবার ইনসুলিন ইনজেকশন নেওয়ার এক অন্তহীন চক্র।
বছরের পর বছর ধরে এই যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া পার করতে গিয়ে রোগীরা যে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যান, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ইনজেকশন ফ্যাটিগ’ বলা হয়।
এই ক্লান্তি থেকে ইনজেকশনের বদলে একটি সহজ ওরাল পিল বা মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট নেওয়ার ইচ্ছা জাগা খুবই স্বাভাবিক। তবে ভেতরের চিকিৎসাগত বাস্তবতা না বুঝে সুই বা নিডল এড়িয়ে যাওয়ার এই চেষ্টা ডেকে আনতে পারে তাৎক্ষণিক ও ভয়াবহ পরিণতি।
ভারতের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডক্টর প্রিয়ম বর্দলৈ সম্প্রতি একটি বাস্তব কেস স্টাডি সামনে এনেছেন, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এক নির্মম ও চোখ খুলে দেওয়ার মতো সতর্কবার্তা।
ঘটনাটি ছিল একজন ২৬ বছর বয়সি যুবকের, যিনি কৈশোরেই টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন ইনসুলিন ইনজেকশন নেওয়ার যন্ত্রণাদায়ক রুটিন অনুসরণ করতে করতে তিনি চরমভাবে ক্লান্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সুইয়ের খোঁচা থেকে মুক্তি পাওয়ার এক মরিয়া চেষ্টায় তিনি কাউকে না জানিয়ে ইনসুলিন ইনজেকশন নেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।
তিনি তার এক বয়স্ক আত্মীয়ের কাছ থেকে (যিনি টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ট্যাবলেট খেতেন) গোপনে ওরাল ট্যাবলেট এনে খাওয়া শুরু করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, ইনজেকশন বন্ধ করার মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে, সেই যুবক রাতে ঘুমের মাঝেই মারা যান।
অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিস একটি ধীরগতির রোগ যা ধীরে ধীরে চোখ, হার্ট বা কিডনি নষ্ট করে। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মূল চিকিৎসা হঠাৎ বন্ধ করে দিলে তা মুহূর্তের মধ্যে কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের রোগীরা ইনসুলিন নেওয়া বন্ধ করলে শরীরে ঠিক কী ধরণের মারাত্মক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, তা ব্যাখ্যা করেছেন চিকিৎসকেরা।
ভারতের ফোর্টিস সি-ডক হাসপাতালের ডায়াবেটিস বিভাগের চেয়ারম্যান ডক্টর অনুপ মিশ্র বলেন, ‘ইনসুলিন বন্ধ করার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ‘ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস’। তীব্র পানিশূন্যতা, ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা এবং রক্তে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে রোগীর মানসিক বিভ্রান্তি, চেতনা হারানো এবং হৃদযন্ত্রের মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীরা অসুস্থ থাকলেও বা স্বাভাবিকভাবে খেতে না পারলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনো ইনসুলিন বন্ধ করা যাবে না।’
ভারতের ম্যাক্স হেলথকেয়ারের এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের প্রধান ডক্টর অম্বরীশ মিত্তাল জানান, অনেকেই বুঝতে পারেন না যে ইনসুলিন বাদ দিলে টাইপ-১ ডায়াবেটিস কত দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ইনসুলিনের অভাবে রক্তে প্রচুর শর্করা থাকা সত্ত্বেও শরীর এক ধরণের অনাহারী অবস্থায় চলে যায়। এই বিপাকীয় ভারসাম্যহীনতা মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং কিডনিসহ একাধিক অঙ্গকে অচল করে দেয়।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে কেন কাজ করে না টাইপ-২ এর ওরাল পিল?
যুবকটির এই মারাত্মক ভুলের মূলে ছিল দুই ধরণের ডায়াবেটিসের ওষুধের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা। মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট এবং বাহ্যিক হরমোন প্রতিস্থাপনের (ইনসুলিন) মধ্যে বিশাল জৈবিক তফাত রয়েছে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ওষুধ: এই ট্যাবলেটগুলো কেবল টাইপ-২ ডায়াবেটিসের জন্য তৈরি, যেখানে অগ্ন্যাশয় এখনো ইনসুলিন তৈরি করতে পারে, যদিও শরীরের কোষগুলো তা ব্যবহারে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।
এই ওষুধগুলো শরীরের কোষকে ইনসুলিন গ্রহণে সংবেদনশীল করে অথবা অলস অগ্ন্যাশয়কে চাপ দিয়ে অবশিষ্ট ইনসুলিন বের করতে সাহায্য করে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের বাস্তবতা: এখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী ‘বিটা কোষ’গুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীরে কোনো ইনসুলিনই থাকে না।
ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস: এক দ্রুতগতির ঘাতক
ইনসুলিনের সম্পূর্ণ অভাব ঘটলে তা বছরের পর বছর ধরে নয়, বরং কয়েক ঘণ্টা থেকে দুই-এক দিনের মধ্যে একটি জরুরি চিকিৎসাগত সংকটে রূপ নেয়। যখন শরীর এই সংকটে পড়ে, তখন জরুরি আইসিইউ সহায়তার প্রয়োজন হয়।
ডিকেএ-র প্রধান লক্ষণসমূহ:
ফলের মতো বা রাসায়নিকের মতো শ্বাস: রক্তে অ্যাসিটোনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে রোগীর মুখ থেকে পাকা ফল বা নেইল-পলিশ রিমুভারের মতো এক ধরণের মিষ্টি বা রাসায়নিকের গন্ধ বের হয়।
কুশমাউল ব্রিদিং: রোগী ক্রমাগত বুক ফুলিয়ে গভীর, ভারী এবং অত্যন্ত কষ্টদায়কভাবে শ্বাস নিতে থাকেন। শরীর থেকে অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দিয়ে রক্তে জমে থাকা বিপাকীয় অ্যাসিড কমানোর এটি ফুসফুসের একটি মরিয়া চেষ্টা।
তীব্র পানিশূন্যতা ও চেতনা হ্রাস: রক্তে শর্করার মাত্রা আকাশচুম্বী হওয়ায় কিডনি তা দূর করতে অতিরিক্ত কাজ করে। এর ফলে তীব্র তৃষ্ণা, প্রচণ্ড বমি, চরম দুর্বলতা দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে রোগী সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন।
ইনসুলিন কেন ট্যাবলেট হিসেবে পাওয়া যায় না?
বিজ্ঞানীরা কোটি কোটি ডলার খরচ করেও কেন আজ পর্যন্ত ফার্মেসির তাকে একটি কার্যকর ইনসুলিন পিল বা ট্যাবলেট নিয়ে আসতে পারলেন না? বাধাটি ইনসুলিনে নয়, বাধাটি মানুষের পাচনতন্ত্রে।
ইনসুলিন হলো একটি অত্যন্ত জটিল প্রোটিন হরমোন। আমাদের পাকস্থলী প্রোটিন জাতীয় খাবার হজম করার জন্য হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড এবং পেপসিনের মতো এনজাইম তৈরি করে।
ফলে একটি সাধারণ ইনসুলিন ক্যাপসুল গিলে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই পাকস্থলীর তরল সেই হরমোনটিকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলে, যার ফলে রক্তে পৌঁছানোর আগেই এটি সম্পূর্ণ কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে।
বর্তমানে গবেষকেরা ন্যানোটেকনোলজি ম্যাট্রিক্স, মাইক্রোনিডল ক্যাপসুল বা লিপিড-কোটেডের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন যাতে ইনসুলিন পাকস্থলী পেরিয়ে ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে অক্ষত অবস্থায় শোষিত হতে পারে। তবে বাণিজ্যিকভাবে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য এমন ওরাল ক্যাপসুল আসতে এখনো বহু বছরের গবেষণার প্রয়োজন।
আপাতত টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের বেঁচে থাকার একমাত্র ও অপরিহার্য উপায় হলো ইনজেকশন বা ইনসুলিন পাম্পের মাধ্যমে ইনসুলিন গ্রহণ করা। খাবারের সময়ের জন্য ইনহেলড ইনসুলিন (নাকের মাধ্যমে নেওয়ার ইনসুলিন) নিয়ে কিছু কাজ হলেও সাধারণ ওরাল ট্যাবলেট কোনো বিকল্প নয়।
তাই ইনজেকশন নিতে নিতে যদি আপনি চরম ক্লান্ত বা অবসাদগ্রস্ত বোধ করেন, তবে নীরবে কষ্ট পাবেন না এবং নিজে থেকে বা অন্যের প্রেসক্রিপশন দেখে কোনো ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন না। আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
বর্তমানে কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর বা স্মার্ট ইনসুলিন পাম্পের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিদিনের এই সুই ফোটানোর ঝামেলা ও মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। মনে রাখবেন, আপনার ইনসুলিন নেওয়ার রুটিন কোনো লাইফস্টাইল চয়েস বা শখ নয়; এটি আপনার বেঁচে থাকার একমাত্র পন্থা।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন
মন্তব্য (০)