নিউজ ডেস্ক : বর্ষাকাল প্রকৃতিকে যেমন সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলে, তেমনি এই মৌসুমে বেড়ে যায় নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিও। বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার, দূষিত পানি এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে এ সময় সর্দি-কাশি, জ্বর, ভাইরাল সংক্রমণ, ডায়রিয়া, পেটের সমস্যা ও ত্বকের বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়তে দেখা যায়।
তাই বর্ষাকালে সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি শক্তিশালী রাখা। এর জন্য দামি ওষুধের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে প্রতিদিনের সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস। দৈনন্দিন খাবারে কিছু পুষ্টিসমৃদ্ধ উপাদান যোগ করলে শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি অর্জন করে এবং মৌসুমি রোগের ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে আসে।
ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ ফল রাখুন প্রতিদিনের তালিকায়
ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরকে লড়াই করতে সহায়তা করে।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কমলা, মাল্টা, লেবু, পেয়ারা, আমলকি কিংবা কিউইয়ের মতো ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ ফল রাখার চেষ্টা করুন। এসব ফল শুধু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় না, শরীরকে সতেজ রাখতেও সাহায্য করে।
মৌসুমি শাকসবজি খান নিয়মিত
বর্ষাকালে বাজারে সহজেই পাওয়া যায় নানা ধরনের তাজা শাকসবজি। এসব সবজিতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল এবং খাদ্যআঁশ, যা শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে। খাদ্যতালিকায় পালং শাক, লাল শাক, গাজর, লাউ, ঝিঙা, করলা, কুমড়া, ব্রকোলি কিংবা ফুলকপির মতো সবজি নিয়মিত রাখুন।
আদা ও রসুনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা
আদা ও রসুনে থাকা প্রাকৃতিক জৈব উপাদান শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। প্রতিদিনের রান্নায় আদা ও রসুন ব্যবহার করলে খাবারের স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনি স্বাস্থ্যগত উপকারও পাওয়া যায়। বর্ষার দিনে এক কাপ গরম আদা চা অনেকের জন্য স্বস্তিদায়ক পানীয় হতে পারে।
দই ও প্রোবায়োটিক খাবারের গুরুত্ব
অন্ত্র সুস্থ থাকলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ভালোভাবে কাজ করে। দইয়ের মতো প্রোবায়োটিক খাবার অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং হজমশক্তিও উন্নত করে। তবে অবশ্যই তাজা এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংরক্ষিত দই খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করুন
প্রোটিন শরীরের কোষ মেরামত এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল, ছোলা, মসুর এবং সয়াবিনজাতীয় খাবার রাখুন। নিরামিষভোজীরা বিভিন্ন ধরনের ডাল, বাদাম ও সয়াবিন থেকে পর্যাপ্ত প্রোটিন পেতে পারেন।
বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার রাখুন খাদ্যতালিকায়
কাঠবাদাম, আখরোট, কাজুবাদাম, চিনাবাদাম, তিসি এবং কুমড়ার বীজে রয়েছে স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ই এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। পরিমিত পরিমাণে এসব খাবার খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত পানি পান করতে ভুলবেন না
বর্ষাকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হলেও শরীরের পানির প্রয়োজন কমে যায় না। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে এবং বর্জ্য পদার্থ সহজে বের হয়ে যায়। তাই প্রতিদিন নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করার বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
গরম স্যুপ ও তরল খাবার হতে পারে উপকারী
সবজি, ডাল কিংবা মুরগির স্যুপ বর্ষাকালে শরীর উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে। এগুলো সহজপাচ্য হওয়ার পাশাপাশি শরীরের তরলের ঘাটতি পূরণেও ভূমিকা রাখে। তবে অতিরিক্ত লবণ, ক্রিম বা চর্বিযুক্ত স্যুপ এড়িয়ে চলাই ভালো।
রাস্তার খাবার ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া থেকে দূরে থাকুন
বর্ষাকালে খাবার সহজেই দূষিত হয়ে যেতে পারে। তাই খোলা পরিবেশে বিক্রি হওয়া কাটা ফল, ফুচকা, চটপটি কিংবা অপরিষ্কার পরিবেশে প্রস্তুত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবারও হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং শরীরকে দুর্বল করে দিতে পারে।
ঘরে তৈরি তাজা খাবারই হোক প্রথম পছন্দ
বাইরের খাবারের পরিবর্তে ঘরে তৈরি গরম ও তাজা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। রান্নার আগে ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন এবং রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রেখে দেবেন না। এতে খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
শুধু খাবার নয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও জরুরি
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে শুধু পুষ্টিকর খাবার খেলেই হবে না; জীবনযাপনেও আনতে হবে ইতিবাচক পরিবর্তন। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে খাওয়ার আগে এবং বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস অনেক সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বর্ষাকালে সুস্থ থাকার জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বরং ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং পর্যাপ্ত পানিসমৃদ্ধ একটি সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী রাখতে সবচেয়ে কার্যকর।
এর পাশাপাশি নিরাপদ খাবার নির্বাচন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তুললে বর্ষাকালের সাধারণ সংক্রমণ থেকে নিজেকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। মনে রাখবেন, সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় উপায় হলো সচেতনতা এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।
তথ্যসূত্র: মায়ো ক্লিনিক (Mayo Clinic), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (National Institutes of Health)
মন্তব্য (০)