• সমগ্র বাংলা

স্বাস্থ্য সহকারী থেকে ‘পরিসংখ্যানবিদ’! কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আট বছরের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন

  • সমগ্র বাংলা

ছবিঃ সিএনআই

গাজীপুর প্রতিনিধি : গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশাসনিক বাস্তবতা এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারি নিয়োগ স্বাস্থ্য সহকারী পদে হলেও আট বছরের বেশি সময় ধরে একজন কর্মচারী পরিসংখ্যান ও আইটি শাখায় পরিসংখ্যানবিদের দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু দায়িত্ব পালনই নয়, অফিস কক্ষের নামফলকেও নিজ পরিচয় ‘পরিসংখ্যানবিদ’ হিসেবে উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নিয়ে কৌতূহলের পাশাপাশি প্রশাসনিক বৈধতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক। তিনি ২০০৪ সালে কালীগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরসাদী ইউনিয়নে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের
স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। অথচ বর্তমানে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান হিসেবে আইটি শাখার দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য সহকারীদের মূল দায়িত্ব হলো মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন, রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে কাজী নাজমুল হককে প্রতিদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১০২ নম্বর কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ল্যাপটপের মাধ্যমে পরিসংখ্যানবিদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই কক্ষের দরজায় তার নামের নিচে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘পরিসংখ্যানবিদ’। সেখানে কোথাও ‘ভারপ্রাপ্ত’, ‘অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত’ কিংবা ‘চলতি দায়িত্ব’ শব্দগুলো উল্লেখ নেই। ফলে সাধারণ সেবাগ্রহীতা থেকে শুরু করে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও তাকে স্থায়ী পরিসংখ্যানবিদ বলেই ধরে নেন।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাদেকুর রহমান আকন্দের দায়িত্বকালে কর্মরত পরিসংখ্যানবিদ মীর সাইফুল ইসলাম বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর একই বছরের ১২ জুলাই ডা. সাদেকুর রহমান আকন্দ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্বাস্থ্য সহকারী মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হককে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে পরিসংখ্যানবিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কাজী নাজমুল হক একটি নথি দেখিয়ে দাবি করেন, পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৭ জুলাই তৎকালীন গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মো. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত আরেকটি আদেশে তাকে শূন্য থাকা পরিসংখ্যানবিদ পদে নিজ বেতনে দায়িত্ব পালনের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, নিয়মিত পরিসংখ্যানবিদ পদায়ন হলে তাকে পূর্বের স্বাস্থ্য সহকারী পদে ফিরে যেতে হবে।

তবে ওই নথি নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। প্রতিবেদকের হাতে আসা কপিতে দেখা যায়, আদেশপত্রের উপরের অংশে মাস ও সাল কম্পিউটারে টাইপ করা থাকলেও তারিখের ঘর ফাঁকা ছিল। পরে সেই স্থানে হাতে লেখা ‘৭’ বসানো হয়েছে। একইভাবে চিঠির মূল অংশের অন্তত দুটি স্থানে কম্পিউটারে টাইপের পরিবর্তে হাতে লেখা সংশোধন রয়েছে। ফলে নথিটির প্রামাণিকতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সংশয় তৈরি হয়েছে।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে পরিসংখ্যানবিদ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন শূন্য থাকা পরিসংখ্যানবিদের পদটি অনলাইন জনবল ব্যবস্থাপনায় পূরণ দেখানো হয়েছে। এতে ওই পদে নতুন কর্মকর্তা পদায়নের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাদের ভাষ্য, তথ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকার সুযোগে তিনি এ প্রক্রিয়াকে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করেছেন।

অভিযোগের আরেকটি দিক হলো সরকারি আর্থিক সুবিধা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে প্রাপ্য শ্রান্তি বিনোদন ভাতাও উত্তোলন করেছেন। সরকারি বিধিমালার আলোকে বিষয়টি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, অনলাইন জনবল ব্যবস্থাপনা ও তথ্য হালনাগাদের দায়িত্বে থাকায় কাজী নাজমুল হক দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদটিকে পূরণ দেখিয়ে রেখেছেন। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বে আসা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনিক প্রভাবও বিস্তার করেছেন। এতে অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীও বিব্রত ছিলেন।

অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক বলেন, “আমি কোনো পদ দখল করে বসে নেই। কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। অফিসের পরিচয়ফলক বা দায়িত্ব বণ্টন প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছে। বেতন-ভাতা সরকারি নিয়ম অনুসারেই গ্রহণ করেছি।”

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ বলেন, “আমি এখানে যোগদানের আগ থেকেই, অর্থাৎ প্রায় আট বছর ধরে স্বাস্থ্য সহকারী নাজমুল হক পরিসংখ্যানবিদের দায়িত্ব পালন করছেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর জানতে পারি পদটি শূন্য রয়েছে। এরপর থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে পদটি শূন্য হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে। নামফলকেও এখন থেকে ‘ভারপ্রাপ্ত’ উল্লেখ করা হবে।”

গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, “পরিসংখ্যানবিদের পদ শূন্য থাকায় স্বাস্থ্য সহকারী নাজমুল হককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নামফলকে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ বা অনুরূপ উল্লেখ থাকা উচিত ছিল।”

ঘটনাটি সামনে আসার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ বছরের পর বছর শূন্য থাকলেও সেখানে কেন নিয়মিত পদায়ন হয়নি? অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মচারী কীভাবে স্থায়ী পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠলেন? আর যদি সত্যিই অনলাইন জনবল ব্যবস্থাপনায় শূন্য পদ পূরণ দেখানো হয়ে থাকে, তবে সেই দায় কার?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক তদন্ত। তদন্তেই স্পষ্ট হবে অভিযোগের ভিত্তি কতটা বাস্তব, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোথাও অনিয়ম হয়েছে কি না এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে স্বাস্থ্য বিভাগ কী পদক্ষেপ নেয়।

মন্তব্য (০)





image

মুক্তাগাছায় ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক সমাবেশ অনুষ্ঠিত

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর মুক্তাগাছা এসএমই/কৃষি শ...

image

মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় প্রবাসীর স্ত্রীকে কুপিয়ে জখম

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি : চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় প্...

image

কালীগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: কৃষিজমি ভরাটে লাখ টা...

গাজীপুর প্রতিনিধি : গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় পৃথক অভিযানে ...

image

পঞ্চগড়ে পুকুর থেকে কিশোরের মরদেহ উদ্ধার

পঞ্চগড় প্রতিনিধি : পঞ্চগড়ের মহারাজা দিঘী থেকে ভাসমান অবস্থা...

image

পঞ্চগড়ে বজ্রপাতে দুই জনের মৃত্যু

পঞ্চগড় প্রতিনিধি : পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় পৃথক পৃথক স্থান...

  • company_logo