নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁর ঐতিহাসিক ও সমৃদ্ধশালী একটি উপজেলা হচ্ছে রাণীনগর। রাণীনগর উপজেলা জেলা শহরের সবচেয়ে নিকটবর্তি উপজেলা। ধান ও সবজি চাষে বিখ্যাত এই উপজেলার ইতিকথা তুলে ধরে নিজের সরকারি ও ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজে একটি তথ্যসমৃদ্ধ লেখা প্রকাশ করেছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
পুলিশ সুপার নওগাঁতে যোগদানের পর থেকে প্রতিটি উপজেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরছেন যা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে জেলার গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে। পুলিশ সুপারের এমন সৃজনশীল কাজকে সাধুবাদ জানিয়েছে জেলার সচেতন মহল।
সম্প্রতি পুলিশ সুপার তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাণীনগর উপজেলার নামকরনসহ যে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেছেন তা হলো ব্রিটিশ কলোনিয়াল পিরিয়ডে বাংলাদেশের যে সমস্ত পুলিশ থানা প্রতিষ্ঠিত হয় তার মধ্যে নওগাঁ জেলার রাণীনগর অন্যতম। নওগাঁ জেলার একটি প্রাচীন থানা/প্রশাসনিক ইউনিট হলো রাণীনগর থানা যা ১৮৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাণীনগর থানার নামকরণ নিয়ে মূলত দুটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি রয়েছে। প্রথমত: সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী নাটোরের বিখ্যাত জমিদার রানী ভবানী (যিনি অর্ধবঙ্গেশ্বরী নামে পরিচিত ছিলেন) তার বাবার বাড়ি পাশ^র্বর্তি বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার ছাতিয়ানগ্রাম যাওয়ার পথে বর্তমান রাণীনগর বাজার এলাকায় যাত্রা বিরতি ও বিশ্রাম নিয়েছিলেন। রানীর এই অবস্থানের স্মৃতিকে ধরে রাখতে পরবর্তীকালে এই জায়গার নাম রাখা হয় রাণীনগর।
অন্য একটি ঐতিহাসিক মতানুসারে, ১১শ-১২শ শতাব্দীতে এই অঞ্চলে পাল বংশের প্রভাবশালী জমিদার খট্টেশ্বর রাজা শাসন করতেন। তার অত্যন্ত প্রভাবশালিনী রানীর সম্মানে এই মৌজার নাম রাখা হয়েছিল রাণীনগর। আর রাজার নামানুসারে এই পরগনার নাম হয় খট্টেশ্বর পরগনা। বর্তমান রাণীনগর উপজেলার ১নং ইউনিয়নের নাম এখনও খট্টেশ্বর রাণীনগর। ইংরেজ সেটেলমেন্ট রেকর্ডেও এই অঞ্চলের পরগনার নাম “খট্টেশ্বর” এবং মৌজার নাম “রাণীনগর” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্যসূত্র বাংলাদেশ (জাতীয় তথ্য বাতায়ন, বাংলাপিডিয়া, স্থানীয় ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ সমূহ, ব্রিটিশ সেটেলমেন্ট রেকর্ড)।
পাল বংশীয় প্রভাবশালী রাজা খট্টেশ্বর-এর নামানুসারে এই এলাকার নাম হয়েছে খট্টেশ্বর পরগনা। পাল রাজার নাম অনুসারে এই এলাকায় খট্টেশ্বর রাণীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং খট্টেশ্বর রাণীনগর পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদ নামকরণ করা হয়েছে। খট্টেশ্বর পরগনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থাকলেও আধুনিক রাণীনগর শহর বা জনপদের মূল ভিত্তিটি তৈরি হয়েছে ১৮৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই থানাকে কেন্দ্র করেই। থানার প্রশাসনিক শক্তি এবং রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের পর রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে খট্টেশ্বর রাণীনগর বাজারটি এই অঞ্চলের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপ নেয়।
১৯২৫ সালে ব্রিটিশ শাসন আমলে রাণীনগর রেল স্টেশনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্প্রতি এই রেল স্টেশনের শতবর্ষ উদযাপিত হয়। ১৯৮৩সালে এই থানাকে কেন্দ্র করে রাণীনগর এলাকাটি নিয়ে রাণীনগর উপজেলা গঠিত হয়। রাণীনগর থানা এলাকার আয়তন ২৫৮.৩৩ বর্গ কিলোমিটার যেখানে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ লোকের বসবাস।
বর্তমানে রাণীনগর থানা এলাকার আইন-শৃঙ্খলা যথেষ্ট ভালো। একসময় আত্রাই-রাণীনগর এলাকায় চরমপন্থীদের যথেষ্ট তৎপরতা ছিল। কিন্তু গত এক দশকে পুলিশের এবং অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমবর্ধমান অভিযানের মুখে এলাকার আইন-শৃঙ্খলা এখন যথেষ্ট ভালো। রাণীনগর এলাকার প্রধান অপরাধের মধ্যে রয়েছে সড়কে ছিনতাই, চুরি, প্রতারণা, মাদক নারী ও শিশু বিষয়ক অপরাধ এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ। বর্তমান পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে রাণীনগর থানা পুলিশ পুরাতন এই জনপদের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট তৎপর রয়েছে। আগামীতেও এই জনপথের শান্তি বজায় রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকবে বলেও তিনি জানান।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান বর্তমানে কেউ খুব প্রয়োজন ছাড়া ইতিহাস ভিত্তিক বই পড়ে না। তবে নিজের এলাকার ইতিকথা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে পৌছে দেওয়া জরুরী। যেহেতু বর্তমান সময় হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির যুগ তাই জেলার প্রতিটি উপজেলা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর সংক্ষিপ্ত ইতিকথাগুলো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি যেন পাঠকরা অল্প সময়ের মধ্যে একটি এলাকার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন এবং অন্যদের জানাতে পারেন। এমন ভাবনা থেকেই তিনি এমন লেখার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেস্টা করে যাচ্ছেন। এতে নিজের যেমন জানা হচ্ছে তেমনি ভাবে অন্যদেরও জানানো হচ্ছে। আগামীতেও এই ধরণের কর্মকান্ড অব্যাহত রাখার আশা ব্যক্ত করেন এই কর্মকর্তা।
মন্তব্য (০)