নিউজ ডেস্ক : বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ যখন ক্রমেই বাড়ছে এবং উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে, ঠিক সেই সময় নতুন করে ৩৯০ কোটি (৩.৯ বিলিয়ন) ডলার বিদেশি ঋণ ও অনুদানের খোঁজে নেমেছে সরকার। অবকাঠামো, রেল, বস্তি উন্নয়ন, সেতু, জলবায়ু সহনশীল নগরায়ণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কারিগরি শিক্ষা ও গবেষণাসহ ১৭টি নতুন প্রকল্পের জন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছে অর্থায়ন চাওয়া হবে। এসব প্রকল্পের প্রস্তাব শিগগিরই ফরেন এইড সার্চ কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) আকারে প্রস্তুত হওয়া প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্য অর্থায়ন উৎস নির্ধারণ করবে ফরেন এইড সার্চ কমিটি। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি), জাইকা, কোইকা, ইউএনডিপি, সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছে ঋণ ও অনুদানের প্রস্তাব পাঠানো হবে। ২০২৬ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশি অর্থায়নের তালিকায় সবচেয়ে বড় প্রকল্প রাজধানীর করাইল, সাততলা ও ভাষানটেক এলাকার বস্তি উন্নয়ন। ৯৬ কোটি ডলার ব্যয়ের এ প্রকল্পে নিরাপদ পানি সরবরাহ, আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ সড়ক, জনস্বাস্থ্য এবং নগর পরিবেশ উন্নয়নের কাজ করা হবে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রকল্প বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ। সংশোধিত প্রস্তাবে এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা ২০১৮ সালের অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। শুরুতে ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা এগোয়নি। পরে ভারতীয় ঋণের আওতাভুক্ত কয়েকটি প্রকল্প থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তের পর এখন এআইআইবি, এডিবি ও আইএসডিবির কাছ থেকে অর্থায়নের চেষ্টা করছে সরকার। যে সংস্থা তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ দেবে, তাদের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশি অর্থায়নের তালিকায় আরও রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের ২৫ কোটি ডলারের জলবায়ু-সহনশীল ও সবুজ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, এলজিইডির ২৭ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের গ্রামীণ সড়কে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ, ১৪ কোটি ডলারের মোংলা সেতু নির্মাণ এবং ১৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের কল্যাণপুর খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ১ হাজার ১৩ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ের ‘লিভারেজিং রেমিট্যান্স ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের জন্যও বিদেশি অর্থায়ন চাইছে। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমানো, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের আয় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিএমইটি ঢাকা টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ভাষা ল্যাব ও অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ স্থাপনের জন্য ৩১ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্পও বিদেশি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ১ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের সক্ষমতা বাড়াতে চায়। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার কোইকা ১ কোটি ২৯ লাখ ডলার অনুদান দেবে, আর বাকি অর্থ দেবে সরকার। এছাড়া বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) বর্জ্য বায়োমাস থেকে সার উৎপাদন, মাছের বর্জ্য থেকে রপ্তানিযোগ্য জৈব উপাদান তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি মূল্যায়নসংক্রান্ত চারটি গবেষণা প্রকল্পের জন্যও বিদেশি অনুদান চেয়েছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি অর্থায়নের জন্য কোনো প্রকল্প প্রথমে পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদন পায়। পরে প্রকল্পটি বিদেশি অর্থায়নের উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য ইআরডিতে পাঠানো হয়। ফরেন এইড সার্চ কমিটি প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী সম্ভাব্য উন্নয়ন সহযোগী নির্বাচন করে। অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঋণদাতা সংস্থার অগ্রাধিকার ও শর্ত বিবেচনায় রেখেই প্রকল্পের নকশা প্রস্তুত করা হয়, যাতে অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৪৭৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। এর মধ্যে ১৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার ছিল বাজেট সহায়তা। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি নতুন অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য চলতি বাজেটে বৈদেশিক সহায়তা হিসাবে ৪৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মন্তব্য (০)