• অপরাধ ও দুর্নীতি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনা বিভাগে সনদ জালিয়াতির অভিযোগ, প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগপ্রক্রিয়া

  • অপরাধ ও দুর্নীতি

ছবিঃ সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর পরিকল্পনা বিভাগে শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনকারী মো. নজরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের নিয়োগ ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাভার পৌরসভার অভিজ্ঞতার সনদে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করে স্থপতি পদে নিয়োগ নেওয়া, প্রায় ২২ বছর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সাভার পৌরসভায় সংশ্লিষ্ট সময়ে সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ বা সহকারী অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ পদ ছিল না। এমনকি ওই পৌরসভায় নজরুল ইসলামের চাকরির তথ্যও পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগের জন্য পাঁচ বছরের প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। ওই পদে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের চলতি দায়িত্বও পেয়েছেন।

অন্যদিকে, সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করে স্থপতি পদে নিয়োগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, অভিযোগ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তদন্তের পর তাঁকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথির স্বাধীন যাচাই এবং আইনগত পদক্ষেপের বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট নয়।

অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের নিয়োগবিধি অনুযায়ী, নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগের জন্য নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সহকারী নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও এই শর্তের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

অভিযোগ অনুযায়ী, নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগের আবেদনের সঙ্গে নজরুল ইসলাম সাভার পৌরসভায় কাজ করার একটি অভিজ্ঞতার সনদ জমা দেন। কিন্তু সনদে উল্লিখিত সময়ে ওই পৌরসভায় সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ বা সহকারী অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ নামে কোনো পদ ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি ওই সময়ে তিনি সাভার পৌরসভায় অন্য কোনো পদেও চাকরি করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সাভার পৌরসভার রেকর্ডপত্রেও নজরুল ইসলামের চাকরির গ্রহণযোগ্য তথ্য নেই। এ দাবি সত্য হলে নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগের জন্য নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত তিনি পূরণ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনে নজরুল ইসলামের নিয়োগের সময়ই তাঁর অভিজ্ঞতার সনদ নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। এ বিষয়ে অভিযোগও জমা পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে তাঁর নিয়োগপত্র দীর্ঘদিন আটকে ছিল এবং তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগের পরিচয় ও বড় অঙ্কের ঘুষের মাধ্যমে তিনি চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

নজরুল ইসলামের নিয়োগের সময় সনদ যাচাইয়ের দায়িত্বে কারা ছিলেন, আপত্তি ওঠার পর কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোন নথি বিবেচনা করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনা বিভাগে সিরাজুল ইসলামের দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের আকস্মিক মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়। সে সময় স্থপতি পদে দায়িত্ব পালনকারী সিরাজুল ইসলামকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা তাঁর ছিল না। স্থপতি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাঁর বিরুদ্ধে জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। এরপরও তিনি প্রায় ২২ বছর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্বে বহাল ছিলেন।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সাময়িকভাবে কোনো কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট পদে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও স্থায়ী নিয়োগের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের দাবি।

এই সময়ে মেয়র, প্রশাসক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল, কেন পদটিতে নিয়মিত নিয়োগ দেওয়া হয়নি এবং দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্তগুলো কোন প্রশাসনিক যুক্তিতে নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকার সুযোগে তিনি বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করেছেন।

তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ডিএসসিসির তদন্তের অগ্রগতি, অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়নি।

সিরাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার পর গত ৫ সেপ্টেম্বর মো. নজরুল ইসলামকে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি নগর পরিকল্পনাবিদের মূল পদেও দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে তাঁর নিয়োগের সময় দাখিল করা অভিজ্ঞতার সনদ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যে পদে নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল, তা পূরণ হয়েছিল কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে নিয়োগের বৈধতা, দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক ভিত্তি এবং পরবর্তী পদায়নের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্ন উঠতে পারে।

ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনা বিভাগ ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো উন্নয়ন, নগর সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত। ফলে এ বিভাগের শীর্ষ পদে নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নগর উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রকল্পভিত্তিক তথ্য ছাড়া ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে যোগ্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতা, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্বে পদ পরিচালনা এবং নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

নিয়োগ ও পদায়নসংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তিতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নজরুল ইসলামের সাভার পৌরসভার অভিজ্ঞতার সনদ কে যাচাই করেছিলেন এবং কীভাবে তা গ্রহণ করা হয়েছিল, সনদে উল্লেখ করা পদ ও চাকরির মেয়াদের সঙ্গে পৌরসভার মূল নথির মিল রয়েছে কি না এবং নিয়োগের সময় ওঠা অভিযোগ কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল, সেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

একইভাবে, সিরাজুল ইসলাম কী ভিত্তিতে ২০০৪ সাল থেকে দীর্ঘ সময় প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রকল্পসংক্রান্ত অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কোনো নিরীক্ষা বা তদন্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ডিএসসিসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ অবস্থানও প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনা বিভাগে নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগাম অপরাধী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও সনদের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না।

সাভার পৌরসভার নথি, ডিএসসিসির নিয়োগ ফাইল, সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তদন্তসংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা সম্ভব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার বিষয়টি সামনে এসেছে।

মূল প্রশ্ন শুধু কে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্বে আছেন, তা নয়; বরং নিয়োগের যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, অভিযোগ ওঠার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য (০)





image

ফরিদপুরে মিথ্যা মামলা করে নিজেই কারাগারে বাদী, দুই আসামি ...

১

ফরিদপুর প্রতিনিধি : ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় নারী ও শিশু নির্য...

image

সাতকানিয়ায় ধর্ষণ মামলায় দুই আসামি গ্রেপ্তার

২

সাতকানিয়া(চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের...

image

বিএডিসির দুই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, ১২০ কোটি আত্মসাতে...

৩

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রায় ...

image

জুলাইয়ের হত্যাচেষ্টা মামলায় ফের ২ দিনের রিমান্ডে ডায়মন্ড ...

৪

নিউজ ডেস্ক : জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী আ....

image

‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্য করা যুবকের ৭ দিনে...

৫

নিউজ ডেস্কঃ  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রধানমন্ত্র...

  • company_logo