নিউজ ডেস্কঃ চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে এলে মানুষের ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এতে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও কিছুটা গতি পাবে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এডিবির হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। আর ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা ধীর হয়েছে। তবে এর প্রভাব সীমিত থাকবে বলে মনে করছে এডিবি। ২০২৬ সালের প্রথমভাগে জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমলে ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এডিবির বাংলাদেশ প্রধান চিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নানা পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।
তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার এখনই সময়। এসব সংস্কারের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে এবং শোভন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এর মাধ্যমে অর্থনীতি আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। সংস্কার বাস্তবায়নে এডিবি বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।
কমতে পারে মূল্যস্ফীতি, আবার বাড়ার আশঙ্কা
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও কিছুটা স্বস্তির পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। তবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ।
এডিবি বলছে, জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। মুদ্রানীতি ধীরে ধীরে শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাড়তে পারে চলতি হিসাবের ঘাটতি
২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি দ্বিগুণ হতে পারে বলে জানিয়েছে এডিবি। রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় এ ঘাটতি বাড়বে।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো থাকবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। প্রবাসী আয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হলে বৈদেশিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের চাহিদা ও জোগানের সঙ্গে সমন্বিত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এডিবি।
প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হবে ভোগব্যয়
আগামী অর্থবছরে সেবা ও কৃষি খাত প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। তবে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে গতি কম থাকতে পারে।
উচ্চ সুদহার, ঋণ পাওয়া কঠিন হওয়া, জ্বালানিসংকট এবং বিদেশে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে চাপ থাকবে। এর সঙ্গে দেশের দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত সমস্যাও প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে থাকবে।
এডিবি বলছে, প্রবাসী আয় বাড়ায় মানুষের ভোগব্যয় বাড়তে পারে। ফলে আগামী অর্থবছরে ভোগব্যয়ই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে।
অর্থনীতিতে নানা ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে এডিবি। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে আরও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকা এবং ব্যাংক খাতে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব, উন্নয়ন ব্যয় প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়া এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি।
মন্তব্য (০)