নিউজ ডেস্ক : বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো কোনো দেশের পক্ষে এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ব্রিকসকে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর বিচ্ছিন্ন সক্ষমতাগুলোকে একটি সম্মিলিত সক্ষমতায় রূপ দিতে হবে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ভারতের নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস প্লাস সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং দেশটির জ্বালানি ও ট্রানজিট সক্ষমতা ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও জ্বালানি রুট উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, স্থিতিস্থাপকতা বলতে এমন সক্ষমতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে চাপের মধ্যেও উন্নয়নের ধারা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বজায় রাখা যায়। সীমিত আর্থিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতিকে রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে ফেলে।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, একতরফা নিষেধাজ্ঞা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এটি সরাসরি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও কল্যাণকে প্রভাবিত করে। তাই সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংককে শক্তিশালী করার মাধ্যমে যৌথ সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তার মতে, নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা টেকসই হবে না। অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসন দেখিয়েছে কোনো দেশের অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও উন্নয়ন অবকাঠামোতে হামলার প্রভাব দ্রুত দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিণতি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, এই আগ্রাসনের জন্য ইরানি জনগণকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। নারী, পুরুষ, শিশু ও বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং দেশের উন্নয়নের জন্য কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনা বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বেসামরিক স্থাপনায় হামলাকে স্বাভাবিক করে তোলার প্রবণতা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুতর দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, গাজা ও লেবাননের জনগণ এখনো সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞের পরিণতি ভোগ করছে। সামরিক আগ্রাসন, মানুষের হত্যা এবং তাদের জীবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা না থাকলে আন্তর্জাতিক আইনের কথা বলা অর্থহীন। তাই জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং শক্তি প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা রক্ষায় ব্রিকসকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
সহযোগিতাই দ্বিতীয় স্তম্ভ
সহযোগিতাকে ব্রিকসের দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, আজকের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো কোনো একক দেশ একা সমাধান করতে পারে না। তাই ব্রিকসকে সদস্য দেশগুলোর বিচ্ছিন্ন সক্ষমতাগুলোকে সম্মিলিত সক্ষমতায় রূপ দিতে হবে। টেকসই উন্নয়নকে তিনি তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, যে উন্নয়ন বৈষম্য বাড়ায় অথবা বর্তমানের ব্যয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দেয়, তা টেকসই হতে পারে না।
পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধ পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। ইরানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরও প্রভাব ফেলে।
জ্ঞান ও উদ্ভাবনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেন পেজেশকিয়ান। তার মতে, ব্রিকসকে নিশ্চিত করতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও নতুন প্রযুক্তি যেন আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত না হয়। বরং এগুলোকে দেশগুলোর ক্ষমতায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।
ব্রিকসের সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে ইরান তার সক্ষমতাগুলো কাজে লাগাতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, সহযোগিতা ছাড়া স্থিতিস্থাপকতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, ন্যায়বিচার ছাড়া সহযোগিতা টেকসই হবে না এবং শান্তি ও নিরাপত্তা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ব্রিকসকে এমন একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে, যেখানে এসব নীতিকে বাস্তব কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়া যায়।
মন্তব্য (০)