গাজীপুর প্রতিনিধি: একটি ছোট্ট বার্তা। কয়েকটি শব্দ। তারপর নীরবতা। মাদ্রিদের একটি সাইকেল গ্যারেজে আগুনের মধ্যে আটকা পড়ে সহকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ইউসুফ হাসান আলিফ লিখেছিলেন, “আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।” এরপর আর কোনো বার্তা আসেনি ২৫ বছরের এই তরুণের কাছ থেকে। স্বজনদের কাছে সেটিই এখন আলিফের জীবনের শেষ স্মৃতি।
প্রায় দুই সপ্তাহ পর শুক্রবার সেই বার্তার প্রেরক ফিরলেন নিজের মাটিতে-তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দী হয়ে।
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি যুবক ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে দেশে পৌঁছেছে। সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার মরদেহবাহী বিমান অবতরণ করে। নির্ধারিত সময়ের ২৩ মিনিট পর বিমানটি ঢাকায় পৌঁছালে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরগাঁও গ্রামের বাড়িতে পৌঁছান স্বজনরা। সেখানে শেষবারের মতো তাকে দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা।
বাদ জুমা উত্তরগাঁও উত্তরপাড়া জামে মসজিদে আলিফের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
আলিফের বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় মাত্র দুই মাস আগে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। মাদ্রিদে ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করছিলেন।
প্রবাসজীবন তখনও ঠিকভাবে শুরুই হয়নি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে পেয়েছিলেন কাজের অনুমতি। নতুন কর্মজীবন নিয়ে যখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি, তখনই নেমে আসে বিপর্যয়।
গত ৩০ আগস্ট (রোববার) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে মাদ্রিদের আরগানসুয়েলা এলাকার পালোস দে লা ফ্রন্তেরা এলাকার কাইয়ে কানারিয়াস সড়কের একটি সাইকেল গ্যারেজে আগুন লাগে।
গ্যারেজের ভেতরে আটকা পড়েন আলিফ। আগুনের সঙ্গে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ার মধ্যে শ্বাস নিতে না পেরে সহকর্মীদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আকুতি আর কাউকে তাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেয়নি।
মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলের ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। দীর্ঘ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি গ্যারেজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করা হয়। আগুন পুনরায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সেখানে থাকা অন্যান্য ইলেকট্রিক বাইসাইকেলও বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকরা আলিফকে মৃত ঘোষণা করেন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিষাক্ত ধোঁয়া ও শ্বাসনালিতে মারাত্মক দাহ্য ক্ষতের কারণে তার মৃত্যু হয়।
আলিফের মৃত্যুর পর স্পেনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে আসে শোক। গত ৪ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন প্রবাসী বাংলাদেশিরাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তার নিথর দেহ।
এরপর আইনি প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১০ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের টিকে-১৩৬০ ফ্লাইটে তার কফিনবন্দী মরদেহ ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে রওনা হয়। ইস্তাম্বুল থেকে টিকে-৭৪২ ফ্লাইটে করে শুরু হয় বাংলাদেশের পথে শেষ যাত্রা।
সেই যাত্রার শেষ হলো শুক্রবার সকালে। তবে আলিফের জীবনের যাত্রা শেষ হলো উত্তরগাঁওয়ের পারিবারিক কবরস্থানে।
আলিফ গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুন দম্পতির ছেলে।
বিদেশ যাওয়ার সময় যে বাড়িতে ছিল স্বপ্ন আর প্রত্যাশা, সেই বাড়িতেই শুক্রবার ছিল শুধু কান্না। স্বজনদের আহাজারি, প্রতিবেশীদের নীরবতা আর পরিচিতজনদের চোখের পানি-সব মিলিয়ে উত্তরগাঁও যেন হারিয়ে ফেলেছে তারই এক তরুণ সন্তানকে।
মাত্র দুই মাসের প্রবাসজীবন। নতুন কাজের অনুমতি পাওয়ার আনন্দ। সামনে ছিল অসংখ্য পরিকল্পনা। অথচ একটি অগ্নিকাণ্ড সবকিছুর ইতি টেনে দিল।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, সকালে প্রবাসী বাংলাদেশি ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছেছে। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
মন্তব্য (০)