নওগাঁ প্রতিনিধি: সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলে ১৬জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ১১জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এবং একজনের বাড়ি নওগাঁ শহরের পার-নওগাঁ পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস পাড়ায়।
আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে সৌদি আরবে গিয়ে ওই কারখানায় কাজ করছিল তারা। তারা সবাই ছিলো অবৈধ প্রবাসী। ভাগ্যের চাকা ঘুরানোর আশায় নিহতদের অনেকেই লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি গিয়েছিলো। বর্তমানে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা প্রতিটি পরিবার। এই পরিবারগুলোর প্রতি সার্বিক সহায়তার জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছে স্থানীয়রা। অপরদিকে নিহত সকল প্রবাসীর পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় আত্রাই উপজেলার শাহগোলা ইউনিয়নের উদনপৈ গ্রামের মৃত-ময়েন শেখের ছেলে মো. ফরিদ শেখের বাড়িতে চলছে স্বজনদের শোকের মাতম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে ফরিদ। চার বোনের পর ফরিদ একমাত্র ভাই। অত্যন্ত গরীব পরিবারের সন্তান ফরিদ। ফরিদের সংসারে দুই মা, স্ত্রী, ছোট এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। গত চার বছর আগে বাড়ির দুই শতাংশ জমির মধ্যে এক শতাংশ জমি বিক্রি করে ও বড় বোনেরা ঋণ নিয়ে ভাগ্য বদলের আশায় দালালদের মাধ্যমে ছোট ভাই ফরিদকে সৌদি আরব পাঠায়। বর্তমানে ফরিদের প্রায় ৫লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। বতর্মানে ফরিদকে হারিয়ে তার পরিবার দিশেহারা। কিভাবে তারা ঋণ পরিশোধ করবে, সংসার চালাবে, ছোট দুটি সন্তানকে বড় করবে এমন দুশ্চিন্তায় দিশেহারা এতিম স্ত্রী সুখি বেগম।
নিহত প্রবাসী সকলের পারিবারিক অবস্থা প্রায় ফরিদের মতই। নিহতদের পরিবারের স্বজনদের আহাজারিতে পুরো আত্রাই উপজেলার আকাশ ভারী হয়ে গেছে। নিহতদের পরিবারের দাবী দ্রুত যেন নিহতদের মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে যেন প্রতিটি পরিবারকে সাধ্যমতো আর্থিক ভাবে সহায়তা প্রদান করা হয়। এছাড়া যার যা ঋণ রয়েছে সেই ঋণগুলো মওকুফের ব্যবস্থা করার জোরদাবী নিহতদের পরিবারের সদস্যদের।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামান নিহতের পরিবারের কাছে গিয়ে সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন এবং সার্বিক খোঁজখবরও রাখছেন। সোমবার বিকেলে তিনি নিহতদের সঠিক তালিকা প্রকাশ করেছেন।
নিহতরা হলো উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের দুই ছেলে মো. মোহন আলী ও মো. সুমন। মোহন আলী আট বছর ও সুমন চার বছর যাবত সৌদিতে অবস্থান করছে। একই গ্রামের সাইদুর প্রামাণিকের ছেলে মো. রুবেল প্রামাণিক। রুবেল সাত বছর সৌদিতে অবস্থান করছে। মৃত-বজলুর রহমানের ছেলে কলিমউদ্দিন। কলিম উদ্দিনও আট বছর যাবত সৌদিতে অবস্থান করছে।
বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে মো. সোহেল রানা (ওরফে সুমন)। সুমন আট বছর যাবত সৌদিতে অবস্থান করছে। একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে মো. হাসিবুল হাসান। হাসিবুলও আট বছর যাবত সৌদিতে অবস্থান করছে। সাধনগর গ্রামের আজাহার আলীর ছেলে মো. সাগর আলী। সাগর ছয় মাস হলো সৌদিতে অবস্থান করছে। মাধবপুর গ্রামের মজনু আলীর ছেলে মো. মজিদুল সরদার সজীব। সজীব দুই বছর যাবত সৌদিতে অবস্থান করছে।
পাঁচুপুর ইউনিয়নের পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে মো. জলিল সরদার। জলিল আট বছর যাবত সৌদিতে অবস্থান করছে। মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক। মিনহাজও আট বছর যাবত সৌদিতে অবস্থান করছে।
অপরদিকে নওগাঁ সদর উপজেলার পার-নওগাঁ এলাকার মৃত মজনুর ছেলে শাহীন। শাহীন মাত্র পাঁচ মাস আগে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান নিহত ১২ জন প্রবাসীর পরিবারের খোঁজখবর সব সময় নেওয়া হচ্ছে। নিহতদের মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারদের মাঝে পৌছে দেওয়ার পদক্ষেপ অব্যাগত রাখা হয়েছে। ঢাকাস্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। নিহতদের পরিবারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে কোন সহযোগিতা এলে তা পৌছে দেওয়া হবে। এছাড়া নিহতদের পরিবারের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যা যা করার সুযোগ আছে সেগুলো করা হবে বলে জানান জেলার এই প্রধান কর্মকর্তা।
দ্রুত নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌছে দিতে এবং নি:স্ব পরিবারগুলোকে আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে সার্বিক ভাবে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা প্রদান করার দাবী জানিয়েছেন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা।
মন্তব্য (০)