• লিড নিউজ
  • জাতীয়

বাল্যবিবাহ সামাজিক সংকট: মাহদী আমিন

  • Lead News
  • জাতীয়

ছবিঃ সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক : বাল্যবিবাহ কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং সামাজিক সংকট ও নারীর বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, অনেক পরিবার মনে করে মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই হয়ত সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উলটো, এটি বহু গুণ বড় এক সংকটের জন্ম দেয়। দারিদ্র্য কোনোভাবেই কোনো শিশুর শৈশব বা লেখাপড়া কেড়ে নেওয়ার অজুহাত হতে পারে না। প্রতিটি পিতা-মাতার উপলব্ধি করা উচিত পরিবারের কন্যাসন্তানকে যদি সুরক্ষা ও মর্যাদা দিয়ে যথাযথভাবে বড় করা যায়, তবে সেই একসময় পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা ও আস্থার জায়গা হয়ে ওঠে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকার একটি হোটেলে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের উদ্যোগে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহ্দী আমিন একথা বলেন। বাংলাদেশে বাল্য ও জোরপূর্বক বিবাহ প্রতিরোধ এবং মেয়েশিশুদের অধিকার রক্ষায় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো ‘চাইল্ড, নট ব্রাইড’ শীর্ষক ক্যাম্পেইন। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন এই উদ্যোগের সূচনা করে। 

পরিবর্তিত বাংলাদেশে নারীরা সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলেই তা স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে মাঠ প্রশাসনের ওসি, ডিসি, এসপি থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থায় নারীদের পদচারণা প্রশংসনীয়। সরকার এমন এক সাম্য ও নিরাপত্তার সমাজ গড়তে চায়, যেখানে মেয়েরা সুশিক্ষা ও সমঅধিকার পেয়ে আত্মনির্ভরশীল হবে এবং কন্যাশিশুকে বোঝা না ভেবে সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হবে।

​নারী শিক্ষার প্রসারে অতীতে বিএনপি সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলেই মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু হয়েছিল। বর্তমান নির্বাচিত সরকার তা স্নাতকোত্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া স্বতন্ত্র নারী মন্ত্রণালয় গঠন এবং তৈরি পোশাক খাতের মাধ্যমে লাখ লাখ নারীর কর্মসংস্থানের সূচনাও বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলেই গতি পেয়েছিল।

​তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গর্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন যে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনজন মানুষ তার মা, স্ত্রী ও কন্যা-তিনজনই নারী। তাই নারীর সামগ্রিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এই সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।

বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক সচেতনতা, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর বিশেষ জোর দেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, অনেকে না বুঝে বাল্যবিবাহকে ‘শুভ কাজ’ মনে করে একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেন। এই ব্যাধি দূর করতে মিডিয়া, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মায়েদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করেছে, যার মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছানো হচ্ছে।

​শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে নেওয়া বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পরিবারগুলোর জন্য প্রাথমিক স্তরে মিড-ডে মিল, স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ উপহার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া এসএসসি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়াদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা হচ্ছে। নারীদের পেছনে ফেলে দেশ স্বনির্ভর হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি নীতি প্রণয়ন ও আইন প্রয়োগে সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন এবং একটি বাল্যবিবাহমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। তাই দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে মা, বোন ও কন্যাদের অধিকারকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেওয়া এবং তাদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।

​প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে প্রতিনিয়ত কন্যাসন্তানেরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এমন এক মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি জোর দেন, যেখানে নারীরা পূর্ণ সম্মান নিয়ে বাঁচবে। নারীর ক্ষমতায়ন, আত্মমর্যাদা এবং মেধা-মননের বিকাশকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

বাল্যবিবাহ রোধে এর মূল কারণগুলো চিহ্নিত করার তাগিদ দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, সামাজিক চাপ এবং বিদ্যালয় থেকে মেয়েদের ঝরে পড়াকে বাল্যবিবাহের অন্যতম প্রধান কারণ। অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতা বুঝে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ ও সামাজিক পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

​বয়স বাড়িয়ে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে দেওয়ার অপরাধজনক প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, যে বয়সে একটি কন্যার হাতে খাতা-কলম থাকার কথা, সেই বয়সে তাকে অনৈতিকভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

​মাহদী আমিন মনে করিয়ে দেন, শৈশব প্রতিটি শিশুর জন্মগত অধিকার। কোনো অর্থনৈতিক সংকট বা সামাজিক চাপ যেন কোনো মেয়ের স্বপ্ন ও শৈশবকে বাল্যবিবাহের অন্ধকূপে ঠেলে না দেয়, সে জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

​অনুষ্ঠানে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্রানসেন, বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডেপুটি ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম) নীলিমা ইয়াসমিনসহ সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, সাংবাদিক ও ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররা উপস্থিত ছিলেন।

সচেতনতামূলক প্রচারণা হিসেবে তৈরি গান, ভিডিও এবং পাবলিক সার্ভিস অ্যানাউন্সমেন্ট সেখানে প্রদর্শন করা হয়। প্রচারণামূলক একটি গানে জনপ্রিয় বাউল শিল্পী আলেয়া বেগম ও র‍্যাপার আলী হাসান অংশ নেন।

মন্তব্য (০)





  • company_logo