• মুক্তমত

ফ্যামিলি কার্ড: সামাজিক সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত

  • মুক্তমত

ছবিঃ সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। দেশের নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির বাস্তবায়নও করেছেন দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়েই কথার সঙ্গে কাজের মিল রেখেছেন সরকারপ্রধান। বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধনও করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার এখন অবধি ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু করেছে। তারা প্রতি মাসে দুই হাজার  ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছেন। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

চলতি বছরের জুলাই মাস থেকেই এই কর্মসূচি বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়নের টার্গেট নিয়েছে তার সরকার। এর ফলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রায় ২৬ লাখ ৪৭ হাজার পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করতে ৭ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা প্রদান করা হবে। এরপর থেকেই একটি প্রশ্ন মোটা দাগে সামনে এসেছে। কোত্থেকে আসবে বিপুল অঙ্কের এই টাকা? এক্ষেত্রেও মাস্টার স্ট্রোক খেলতে যাচ্ছে সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাতে বছরের পর বছর ধরে টিআর, কাবিখা, মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তার পরিচিত কর্মসূচিগুলোর পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এর সুফলের চেয়ে আবার নেতিবাচক কথা বা বদনামও কম নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হয় না। বিপুল পরিমাণ এই বরাদ্দকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পুরনো পথে আর হাঁটতে চায় না সরকার। পুরো বরাদ্দকে একীভূত করার পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। 

সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থার এই রূপান্তরের ফলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে সরকারকে অতিরিক্ত কোন অর্থ ব্যয় করতে হবে না। সরাসরি দরিদ্র পরিবারের কাছে নগদ সহায়তা পৌঁছে যাবে। এর মাধ্যমে একসঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি কাজ বাস্তবায়ন করছে সরকার। এক. আগামী অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ পরিবার উপকারভোগী হিসেবে নিয়মিত ভাতার আওতায় চলে আসবে। দুই. এতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তিন. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে, কমে আসবে প্রশাসনিক জটিলতা। চার. বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন অবধারিতভাবেই দেশে দারিদ্র্যতা কমিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। পাঁচ. বরাদ্দকৃত অর্থ সংগঠিত, স্বচ্ছ ও লক্ষ্যভিত্তিক পদ্ধতিতে বিতরণ সম্ভব হবে। সরকারের এই পরিকল্পনাকে দূরদর্শী ও যুগান্তকারী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরি মনে করেন, ছোট প্রকল্পভিত্তিক কর্মসূচিতে অনেক সময় প্রকৃত উপকারভোগীরা বাদ পড়ে যান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একাধিক সুবিধা ভোগ করেন। সরাসরি নগদ সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেশি উপকৃত হবে।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় অনুযায়ী বলা হয়েছে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি যদি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে ১ দশমিক ২৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে। অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৬ লাখ কমবে। এক দশমিক ৫৬ কোটি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসবে। সার্বিক দারিদ্র্য ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে। অতি দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ২ শতাংশ হবে। দারিদ্র্যসীমার ২৫ শতাংশ ওপরে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ হবে, যা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস পাবে। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিকল্পনার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, আগামী চার বছরের মধ্যে ইউনিভার্সাল ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হবে। এই কার্ড হবে প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে, যা হবে নাগরিক হিসেবে একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি। 

সম্প্রতি অর্থ বিভাগের ত্রিপক্ষীয় সভার বিশদ পর্যালোচনায় বলা হয়, টিআর, কাবিখা, মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় সাত হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছওে সেটি বেড়ে হয় সাত হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে প্রায় সাত হাজার ৯০০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছে। কিন্তু এই বরাদ্দের প্রভাব ও দৃশ্যমানতা সীমিতই বলা চলে। এসব প্রকল্পে একটি পরিবারই একাধিকবার বিভিন্ন প্রকল্প থেকে সুবিধা পাচ্ছে। কোনো কোনো অতিদরিদ্র পরিবার কোন রকম সহায়তাই পাচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হচ্ছে না। এসব বিষয় মাথায় রেখেই অর্থ বিভাগ বরাদ্দ অপরিবর্তিত রেখেই ব্যবহার পদ্ধতিতে দৃশ্যমান ও ব্যাপক পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছে। আগামী অর্থবছরের টিআর, কাবিখা, মানবিক সহায়তা ও ইজিপিপি মিলিয়ে সাত হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। একই অর্থ ব্যবহার করে প্রতিটি নির্বাচিত পরিবারকে নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এই ব্যয় দৃশ্যমান উন্নয়ন ফলাফল তৈরি করতে সক্ষম হবে। তাই এই খাতকে একীভূত করে একটি বড়, দৃশ্যমান এবং ফলপ্রসূ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে রূপান্তর করা জরুরি বলে মনে করছে অর্থ বিভাগের ত্রিপক্ষীয় সভা। 

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

মন্তব্য (০)





  • company_logo