নওগাঁ প্রতিনিধি: মাদুর তৈরির প্রধান উপকরণ পাতি ও ধান চাষে সমৃদ্ধ উপজেলা হচ্ছে নওগাঁর রাণীনগর। উপজেলাটি ইতিহাস আর ঐতিহ্যে সমৃদ্ধশালী হলেও কোন বিনোদন কেন্দ্র নেই। বিভিন্ন উৎসবের দিনে পরিবার নিয়ে একটু সময় কাটানোর মতো মুক্ত স্থান নেই। এমন প্রয়োজনের তাগিদে ২০২৪ সালের শেষে দিকে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাইমেনা শারমিন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে উপজেলার রাণীনগর-আবাদপুকুর আঞ্চলিক সড়কের ঐতিহ্যবাহী হাতিরপুল এলাকায় রক্তদহ বিলের সংযোগ খাল রতনডারাকে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে বিনির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
এরপর পুরো রতনডারা খালকে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়। আর খালের দুই পাশের বড় বড় গাছকে বিনোদন কেন্দ্রের উপজীব্য করে গড়ে তোলা হয় রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী। প্রতিটি উৎসবে প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা এই বিনোদন কেন্দ্রে হাজার হাজার প্রকৃতি প্রেমী পর্যটকরা বিশুদ্ধ বিনোদনের আশায় পরিবার নিয়ে ছুটে আসেন। এছাড়া বর্ষার সময় রক্তদহ বিলের জলকেলি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসেন হাজার হাজার পর্যটক।
পরবর্তি সময়ে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রাকিবুল হাসান পাখি পল্লীকে টেকসই ও আরো আকর্ষনীয় করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরমধ্যে সবচেয়ে আকর্ষনীয় হচ্ছে খালের দুই পাশে চলাচলের জন্য ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ। ইতিমধ্যেই পাখি পল্লীতে পাখিদের আনাগোনা বৃদ্ধি করতে রোপন করা হয়েছে পাখি ও পরিবেশ বান্ধব নানা প্রজাতির গাছ। মৎস্য অভয়াশ্রমের মাছ চুরি রোধে এবং পাখি পল্লীর নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে স্থাপন করা হয়েছে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় সিসিটিভি ক্যামেরা।
এছাড়া আসন্ন ইদুল ফিতরকে সামনে রেখে পর্যটন এলাকার বিভিন্ন অবকাঠামোগত উপকরণগুলো হরেক রঙে রঙ্গিন করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। ব্যতিক্রমধর্মী এই ঝুলন্ত ব্রিজ পাখি পল্লীতে আসা পর্যটকদের মাঝে ভিন্ন ধরণের অনুপ্রেরণা যোগাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া এই পাখি পল্লীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন দোকান। যেখানে শতাধিক বেকার মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটকদের আগমনের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি আরো গতিশীল হয়েছে।
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার কুন্দুগ্রাম গ্রামের পর্যটক মামুনুর রশিদ তালুকদার বলেন পরিবারসহ প্রকৃতির সান্নিধ্যে একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে এই পাখি পল্লীর কোন বিকল্প নেই। প্রতিনিয়তই যেভাবে পাখি পল্লীর উন্নয়ন করা হচ্ছে তাতে করে একদিন এই পাখি পল্লী শুধু দেশীয় পর্যটকদের নয় বিদেশী পর্যটকদেরও আরো বেশি আকর্ষন করবে। বিশেষ করে ঝুলন্ত ব্রিজ পাখি পল্লীর প্রতি পর্যটকদের আকর্ষন কয়েকগুন বাড়িয়ে দেবে। আশা রাখি আসন্ন ইদে পর্যটকরা এই পাখি পল্লীতে এসে আগের চেয়ে বেশি বিনোদন পাবেন।
স্থানীয় দোকানী শফিকুল ইসলাম জানান এই পাখি পল্লী ঘিরে হাতিরপুল এলাকায় নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই পাখি পল্লীতে পর্যটকরা আসছেন। তবে দুই ইদ ও অন্যান্য উৎসবের দিনে হাজার হাজার পর্যটকরা আসেন। এই পাখি পল্লী স্থানীয়দের ভাগ্যের চাকা পাল্টে দিয়েছে। আগামীতেও যেন পাখি পল্লীর আধুনিকায়নের সার্বিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড অব্যাহত রাখা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রাকিবুল হাসান জানান আমাদের দেশটি অনেক সুন্দর। তাই ভাবনাগুলোকে সুন্দর করলে প্রতিটি স্থানই সুন্দর হয়। রাণীনগর একটি সমৃদ্ধশালী উপজেলা হওয়া সত্ত্বেও বিনোদনের কোন স্থান নেই। সেই অভাবটি পূরণ করতেই পূর্বের স্যারদের গৃহিত পদক্ষেপগুলোকে জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে শতভাগ বাস্তবায়ন করার চেস্টা করে যাচ্ছেন তিনি। এছাড়া যান্ত্রিক জীবনধারার বাহিরে একটু প্রকৃতির কোলে বসে পরিবারসহ কিছুটা সময় অতিবাহিত করা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ্যধারার বিনোদন কেন্দ্র বিনির্মাণ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই পাখি পল্লীর সৃজন করা। তিনি আশা করছেন আসন্ন রমযানের আগেই ঝুলন্ত ব্রিজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
তিনি আরো জানান ইতিমধ্যেই প্রধান সড়কের পাশে জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের বরাদ্দ করা পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য ছাতাযুক্ত একাধিক আকর্ষনীয় বসার স্থান নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য একটি মুক্তমঞ্চ, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ও ঝুলন্ত ব্রিজ পর্যন্ত আলোকিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুতই গৃহিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। আশা করা যাচ্ছে আসন্ন ইদের আগেই ঝুলন্ত ব্রিজসহ রংকরণ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। এবার ইদে পাখি পল্লীতে এসে পর্যটকরা এক অন্যরকম সুন্দর ও মনোরম পরিবেশ দেখতে পাবেন। আগামীতেও রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লীর উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নের কাজ অব্যাহত রাখার কথা জানান এই কর্মকর্তা।
মন্তব্য (০)