নিউজ ডেস্ক : ইউক্রেনে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কোনো চুক্তি করতে হলে ভূখণ্ডগত বিরোধ মীমাংসা জরুরি—এমনটাই বলেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এক শীর্ষ সহকারী। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের পর তিনি বলেন, এই ইস্যুতে অগ্রগতি ছাড়া সমঝোতার আশা নেই।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আবুধাবিতে শুক্রবার ও শনিবার ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হবে। ডনবাসের অন্তর্ভুক্ত দুই অঞ্চলের একটি দোনেৎস্ক; অন্যটি লুহানস্ক, যার প্রায় পুরোটা ইতোমধ্যে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
প্রধান অচলাবস্থা কোথায়
দুই পক্ষ দোনেৎস্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে একমত হতে পারছে না। পুতিন চান, ইউক্রেন দোনেৎস্কের যে প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা (প্রায় ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার) এখনো রুশ বাহিনী দখল করতে পারেনি, সেখান থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহার করুক। তবে জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি পুতিনকে এই ভূমি ‘উপহার’ দিতে কোনো কারণ দেখেন না।
দোনেৎস্ক ২০২২ সালে রাশিয়া যে চারটি ইউক্রেনীয় অঞ্চলকে একতরফাভাবে সংযুক্ত করার ঘোষণা দেয়, তার একটি। ওই সময় অনুষ্ঠিত তথাকথিত গণভোটকে কিয়েভ ও পশ্চিমা দেশগুলো ভুয়া বলে প্রত্যাখ্যান করে। আন্তর্জাতিকভাবে দোনেৎস্ককে ইউক্রেনের অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে পুতিনের দাবি, দোনেৎস্ক রাশিয়ার ‘ঐতিহাসিক ভূমি’।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দোনেৎস্কের গুরুত্ব
কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে থাকা দোনেৎস্কের অংশে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্ক রয়েছে—যেগুলোকে ‘দুর্গ নগরী’ বলা হয়। এসব শহরের চারপাশে পরিখা, ট্যাংকবিরোধী বাধা, বাঙ্কার ও মাইনফিল্ডসহ শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ইউক্রেনের মতে, দোনেৎস্কের পশ্চিমে ভূমি অপেক্ষাকৃত সমতল; ফলে এই অঞ্চল হারালে রাশিয়ার জন্য দনিপ্রো নদীর পূর্ব তীর ধরে আরও পশ্চিমে অগ্রসর হওয়া সহজ হবে।
জেলেনস্কির আশঙ্কা, দোনেৎস্ক পুরোপুরি ছেড়ে দিলে রাশিয়া ভবিষ্যতে পুনরায় অস্ত্রসংস্থান করে ইউক্রেনের গভীরে হামলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এই অঞ্চল ব্যবহার করতে পারে।
দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি
দোনেৎস্ক নিয়ে লড়াইয়ে উভয় পক্ষই বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বাখমুত শহর দখলের যুদ্ধে রাশিয়া বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করে, যা ‘মিট গ্রাইন্ডার’ নামে পরিচিতি পায়। এসব ক্ষতি আপসকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অগ্রগতির হারে রাশিয়ার দোনেৎস্কের বাকি অংশ দখল করতে আরও অন্তত এক বছর লাগতে পারে। তবে রুশ সামরিক নেতৃত্ব বেশি আশাবাদী। গত ডিসেম্বরে রাশিয়ার জেনারেল স্টাফের প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ পুতিনকে জানান, পুরো ফ্রন্টলাইনজুড়ে অগ্রগতি হচ্ছে এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দিকে তারা এগোচ্ছে।
দোনেৎস্কের শিল্প সম্ভাবনা
যুদ্ধের আগে দোনেৎস্ক ইউক্রেনের কয়লা, সমাপ্ত স্টিল, কোক, কাস্ট আয়রন ও স্টিল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি যোগান দিত। যুদ্ধের ফলে বহু খনি ও কারখানা ধ্বংস হয়েছে। তবু এই অঞ্চলে বিরল খনিজ, টাইটানিয়াম ও জিরকোনিয়াম রয়েছে—যা নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষের জন্য বড় রাজস্বের উৎস হতে পারে।
দোনেৎস্কের ভবিষ্যৎ পুতিন ও জেলেনস্কি—উভয়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। পুতিন নিজেকে বিশ্বজুড়ে জাতিগত রুশদের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেন; দোনেৎস্কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার সেই বয়ানের কেন্দ্রবিন্দু। অন্যদিকে, ২০২২ সালের পর থেকে জেলেনস্কি বড় ও শক্তিশালী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দেশের দৃঢ় রক্ষক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দোনেৎস্ক ছেড়ে দেওয়া—যেখানে এখনও অন্তত আড়াই লাখ ইউক্রেনীয় বাস করেন—অনেকের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হতে পারে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে দোনেৎস্ক থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিরোধিতা করছেন অধিকাংশ ইউক্রেনীয়।
সম্ভাব্য সমঝোতা কী
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের একটি প্রস্তাব অনুযায়ী ডনবাসে কোনো পক্ষের সেনা মোতায়েন থাকবে না এবং অঞ্চলটি নিরস্ত্রীকৃত মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস চলমান আলোচনার বিস্তারিত জানায়নি। বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করলেও বড় কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিত মেলেনি।
ক্রেমলিনের সহকারী ইউরি উশাকভ বলেছেন, কোনো শান্তি চুক্তির আওতায় নিয়মিত সেনার বদলে ডনবাসে রাশিয়ার ন্যাশনাল গার্ড ও পুলিশ মোতায়েনের বিষয়টি তারা নাকচ করছেন না—যা কিয়েভের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। উশাকভ গত মাসে কোমেরসান্তকে বলেন, এই ভূমি রাশিয়ার এবং মস্কোই তা শাসন করবে। জেলেনস্কির ভাষ্য, অঞ্চলটির প্রশাসন কার হাতে থাকবে—সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ইউক্রেনের আইনি সীমাবদ্ধতা
জেলেনস্কি বলেছেন, ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার কোনো ম্যান্ডেট তার নেই। ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী, ভূখণ্ডগত পরিবর্তন কেবল গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে—যার জন্য অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলের ৩০ লাখ যোগ্য ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন। ট্রাম্প এই শর্তের সমালোচনা করে বলেছেন, ভূমি বিনিময়ের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজনীয়তা তিনি মানেন না এবং ‘কিছু ভূমি বিনিময় হবে’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্য (০)