• আন্তর্জাতিক

নেতানিয়াহুকে হটানোর পথে আইজেনকোট, পেরোতে হবে কঠিন ৭ বাধা

  • আন্তর্জাতিক

ছবিঃ সংগৃহীত

নিউজ ডেস্কঃ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর রাজনৈতিক লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বিরোধী শিবিরের। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা। 

তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে দেশটির প্রেসিডেন্ট। এর ফলে ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে নতুন সরকার গঠনের পথ এখনো বেশ কঠিন।

গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতৃত্ব দেওয়া আইজেনকোটকে নতুন সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হচ্ছে। নতুন নেসেটের ৬৭ জন সদস্য তার পক্ষে সরকার গঠনের সুপারিশ করেছেন। বিপরীতে নেতানিয়াহুর পক্ষে রয়েছেন ৪৬ জন। কিন্তু এই সমর্থন এখনো কোনো স্থায়ী সংসদীয় জোটে রূপ নেয়নি। ফলে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেও আইজেনকোটের সামনে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

ইসরাইলের নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হলেও আইজেনকোটের প্রস্তাবিত জোটের চারটি দলের আসনসংখ্যা মাত্র ৪৮। অর্থাৎ, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের তুলনায় তাদের আসন কম।

এই ঘাটতি পূরণে আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাকে। নতুন নেসেটের ৬৭ সদস্য আইজেনকোটের পক্ষে সুপারিশ করেছেন, যাদের মধ্যে আরব দলগুলোর ১৯ জন সদস্যও রয়েছেন। এসব দলের বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে চান তিনি।

কিন্তু আরব দলগুলোর সমর্থন পেলেই যে সরকার দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ, এসব দলের সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্নে বিরোধী জোটের মধ্যেই মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করাই আইজেনকোটের প্রথম বড় পরীক্ষা।

আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিরোধী শিবিরে মতবিরোধ

আইজেনকোটের পরিকল্পনার অন্যতম বড় বাধা আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিরোধী নেতাদের আপত্তি। বিশেষ করে আভিগদর লিবারম্যান এ ধরনের সমর্থননির্ভর সরকার গঠনে রাজি নন।

ইসরাইলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী লিবারম্যানের আশঙ্কা, আরব দলগুলোর সমর্থনে গঠিত সংখ্যালঘু সরকার বেশিদিন টিকবে না। বরং এমন সরকার শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকেই রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার সুযোগ করে দিতে পারে।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে এগোলে নেতানিয়াহু আবার ৭০টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারেন এবং আরও চার বছর দেশ শাসন করতে পারেন।

লিবারম্যানের এই অবস্থান আইজেনকোটের জন্য বড় রাজনৈতিক সমস্যা। কারণ সরকার গঠনের জন্য শুধু সংসদীয় আসনের হিসাব মেলালেই হবে না, বিরোধী জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিকদেরও একমত করতে হবে।

আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা নিয়েও জটিলতা

লিবারম্যান বিকল্প হিসেবে আরেকটি পরিকল্পনা সামনে এনেছেন। তার প্রস্তাব, আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর না করে আল্ট্রা-অর্থোডক্স বা কট্টর ধর্মীয় ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করা হোক।

এই দুই দলের সমর্থন পেলে ৬১ সদস্যের জোট গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি লিকুদ পার্টির তিন-চারজন সংসদ সদস্য দল ছেড়ে নতুন জোটে যোগ দিলে সরকার গঠনের পথ আরও সহজ হতে পারে।

তবে এই পরিকল্পনার সঙ্গে বিরোধী জোটের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সংঘাত রয়েছে। সেটি হলো, আল্ট্রা-অর্থোডক্স তরুণদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছাড়ের অবসান ঘটানো।

ধর্মীয় দলগুলো এই ছাড় স্থায়ী করার পক্ষে। অন্যদিকে আইজেনকোট ও লিবারম্যানসহ বিরোধী নেতারা নির্বাচনের সময় সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক, জাতীয় কিংবা বেসামরিক সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অর্থাৎ আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর সমর্থন পেতে হলে আইজেনকোটকে নিজের জোটের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসতে হতে পারে। আবার সেই ছাড় না দিলে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

সরকার গঠনের শর্তেই আরব দলগুলোর অংশগ্রহণ অনিশ্চিত

আইজেনকোট জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের জন্য চারটি শর্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইসরাইলকে ইহুদি, গণতান্ত্রিক, উদার ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া; স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা; সবার জন্য বাধ্যতামূলক সেবা নিশ্চিত করা এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

বিশেষ করে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার শর্তটি আরব দলগুলোর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তারা সরাসরি মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার পরিবর্তে বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারে।

কিন্তু বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়া আর সরকারে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ কোনো নীতি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে মতবিরোধ তৈরি হলে এসব দলের সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এতে সরকারের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেবে।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পাল্টা কৌশল

আইজেনকোটের সরকার গঠনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি নেতানিয়াহুও বিরোধী জোটের ঐক্য ভাঙতে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে বিরোধীদের রাজনৈতিক সহযোগিতা ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।

নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে নেতানিয়াহু দাবি করছেন, আরব দলগুলো ঘুস ও বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে ভোট চুরি করেছে। তার অনুগত হিসেবে পরিচিত শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনিও আরব রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য প্রমাণের কথা জানানো হয়নি।

শনিবার এক ভিডিওবার্তায় নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেন, আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হলে ইসরাইল কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারবে না। এর পরিবর্তে তিনি নিজের রাজনৈতিক জোটকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।

নেতানিয়াহুর এই অবস্থান আইজেনকোটের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। কারণ সরকার গঠনের আলোচনার পাশাপাশি তাকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রচারণা ও বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও মোকাবিলা করতে হবে।

নেসেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হবে প্রথম বড় পরীক্ষা

সরকার গঠনের আগেই নতুন নেসেটে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে চান আইজেনকোট ও তার সহযোগীরা। নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন বিরোধী দলগুলো বর্তমান স্পিকারকে সরিয়ে নিজেদের পছন্দের কাউকে দায়িত্ব দিতে চায়।

স্পিকার পদে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে নেসেটে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং বিরোধীদের বিভিন্ন উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে।

এর মধ্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ইসরাইলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টিও রয়েছে।

তবে স্পিকার পরিবর্তন কিংবা তদন্ত কমিশন গঠনের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নেও সংসদীয় সমর্থন প্রয়োজন। ফলে সরকার গঠনের আগেই নেসেটে নিজেদের শক্তি ও ঐক্যের প্রমাণ দিতে হবে আইজেনকোটের বিরোধী জোটকে।

সময়সীমার চাপও কম নয়

প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর আইজেনকোট প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন সরকার গঠনের জন্য। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রিসভার পদ বণ্টন, বাজেট ও নীতিগত বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। প্রয়োজনে তিনি আরও ১৪ দিন সময় বাড়িয়ে নিতে পারবেন।

এই সময়ের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে দায়িত্ব আবার নেতানিয়াহুর হাতে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু আরও চার সপ্তাহ সময় পাবেন।

অর্থাৎ আইজেনকোটের হাতে সময় খুব বেশি নেই। একদিকে বিরোধী জোটের মধ্যে সমঝোতা, অন্যদিকে আরব দলগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য দর-কষাকষি—সবকিছুই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে তাকে।

শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?

সব মিলিয়ে আইজেনকোটের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি—সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করা, বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূর করা এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পাল্টা কৌশল মোকাবিলা করা।

তার পক্ষে ৬৭ জন সংসদ সদস্যের সুপারিশ পাওয়া রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু এই সমর্থনকে কার্যকর সরকারে রূপ দিতে হলে বিভিন্ন দলের মধ্যে নীতিগত ও রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।

আইজেনকোট দ্রুত জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের কথা বললেও সেই সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে আরব দলগুলোর সমর্থন এবং আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে বিরোধী শিবিরের অবস্থান কতটা এক করা যায়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসনের অবসানের সম্ভাবনা।

তাই প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া আইজেনকোটের জন্য বড় সাফল্য হলেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লড়াইয়ে এখনো সবচেয়ে কঠিন পথটাই বাকি।

মন্তব্য (০)





image

বাবরি মসজিদ ভাঙার দৃশ্য দেখে কেঁদেছিলাম: সোনিয়া গান্ধী

১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার দৃশ্য টেলিভ...

image

পাকিস্তান ভেঙে ১২ প্রদেশ হচ্ছে?

২

নিউজ ডেস্কঃ  সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনিক কাজ সহজ করার ...

image

চীনে শিশু-কিশোরদের ১৭.৫ শতাংশ মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত: গ...

৩

নিউজ ডেস্কঃ চীনে শিশু ও কিশোরদের ১৭.৫ শতাংশ মানসিক ব্যা...

image

আইজেনকোট কি ইসরাইলের নীতিতে পরিবর্তন আনবেন?

৪

নিউজ ডেস্কঃ ইসরাইলের নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ...

image

রিয়াদে আরামকোর ভবনে ক্ষেপাণাস্ত্র হামলা হুথিদের, ব্যাপক ক...

৫

নিউজ ডেস্কঃ  সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে দেশটির রাষ্ট্রীয়...

  • company_logo