• অর্থনীতি

আয়কর রিটার্ন না দিলে যে ৫ শাস্তি ও বিপদ হতে পারে!

  • অর্থনীতি

ছবিঃ সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশে করব্যবস্থার আওতা বাড়ানো এবং করদাতাদের নিয়মিত রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে কঠোর হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) নেওয়ার পরও অনেকে নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। অথচ আইন অনুযায়ী যাদের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, তাদের নির্ধারিত সময়ে তা জমা না দিলে আর্থিক জরিমানা, কর-সুবিধা হারানো এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণে জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

তাই শুধু টিআইএন নেওয়াই যথেষ্ট নয়; নিজের আয়, করযোগ্যতা এবং রিটার্ন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে কী ধরনের শাস্তি ও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

টিআইএন থাকলেই কি রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক?

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, টিআইএন থাকলেই প্রত্যেককে প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়, আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং প্রযোজ্য বিধানের ওপর।

বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেই যে সব ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকবে না, এমন নয়। নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতা এবং আইন অনুযায়ী যাদের রিটার্ন দাখিল করতে হয়, তাদের আয় কম হলেও বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। অন্যদিকে, যাদের জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক নয়, তাদের ক্ষেত্রে শুধু টিআইএন থাকার বিষয়টি বিবেচনা করেই সব পরিস্থিতিতে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা প্রাপ্তিস্বীকারপত্র প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ব্যবসা পরিচালনা, সম্পত্তি-সংক্রান্ত কাজ কিংবা অন্যান্য নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রিটার্ন না দিলে যে ৫ ধরনের শাস্তি ও জটিলতায় পড়তে পারেন

১. আর্থিক জরিমানা ও অতিরিক্ত দণ্ড

নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারার আওতায় জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। আইনের বিধান অনুযায়ী, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া নির্ধারিত রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে উপকর কমিশনার সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা আরোপ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে জরিমানার ন্যূনতম পরিমাণ এক হাজার টাকা। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।

তবে জরিমানার ক্ষেত্রে আইনে নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে। আগে আয় নিরূপণ করা হয়নি—এমন ব্যক্তিগত করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা পাঁচ হাজার টাকা হতে পারে। আগে আয় নিরূপণ করা হয়ে থাকলে জরিমানার সীমা সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ৫০ শতাংশ অথবা এক হাজার টাকা—দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট তদন্ত বা আইনগত প্রক্রিয়ায় আয়কর-সংক্রান্ত তথ্য, রিটার্ন কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলের বাধ্যবাধকতা অমান্য করলে পৃথক জরিমানার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তবে সব ধরনের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে একই অঙ্কের জরিমানা প্রযোজ্য নয়; সংশ্লিষ্ট ধারার শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

২. কর রেয়াত ও অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি

নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে করদাতারা বিভিন্ন কর রেয়াত বা সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭৪ ধারায় নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করার ক্ষেত্রে কর নিরূপণ ও প্রযোজ্য সুবিধার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।

সাধারণত নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ থাকে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে সংশ্লিষ্ট করদাতা সেই সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা হারাতে পারেন বা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারেন।

সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর-সংক্রান্ত সুবিধা হিসাব করার সময় তাই রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা ও প্রযোজ্য আইন সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। সময়মতো রিটার্ন জমা না দেওয়ার ফলে করের হিসাবেও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

৩. প্রতি মাসে অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে বিলম্বজনিত সুদ

রিটার্ন দাখিলে দেরি হলে শুধু জরিমানাই নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত কর বা বিলম্বজনিত সুদের দায়ও তৈরি হতে পারে।

প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে বকেয়া করের ওপর প্রতি মাসে ২ শতাংশ হারে বিলম্বজনিত সুদ আরোপের বিধান রয়েছে। এর ফলে করদাতার প্রকৃত বকেয়া দায় সময়ের সঙ্গে বেড়ে যেতে পারে।

তবে অতিরিক্ত অর্থের হিসাব নির্ভর করে প্রযোজ্য আইনি বিধান, বকেয়া করের পরিমাণ, অগ্রিম কর ও উৎসে কর্তনের হিসাব এবং বিলম্বের সময়কালের ওপর। তাই প্রত্যেক করদাতার ক্ষেত্রে একই অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ প্রযোজ্য হবে, এমনটি বলা যায় না।

৪. গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সেবা পেতে জটিলতা

আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কার্যকর করতে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সঙ্গে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র যুক্ত করা হয়েছে। ফলে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণ বা নবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের সময় কর-সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রয়োজন হলে তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি কিংবা অন্যান্য সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নও আসতে পারে।

তবে রিটার্ন জমা না দিলেই সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কোন সেবার ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তা সংশ্লিষ্ট আইনের নির্দিষ্ট বিধান ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

৫. চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও দাপ্তরিক কাজে জটিলতা

সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও আয়কর রিটার্ন দাখিল গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট পদ, বেতন বা আইনগত শ্রেণির আওতায় থাকা চাকরিজীবীদের রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে দাপ্তরিক কাজে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র চাওয়া হতে পারে। তা জমা দিতে ব্যর্থ হলে প্রশাসনিক জটিলতা বা প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

একইভাবে, বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছেও আয়কর রিটার্নের কপি বা প্রমাণপত্র চাওয়া হতে পারে। তবে রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে সবার বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে কিংবা বেতন থেকে নির্দিষ্ট অংশ কেটে রাখা হবে—এমন সাধারণ নিয়ম ধরে নেওয়া উচিত নয়। এ ধরনের ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট আইন, চাকরিবিধি ও প্রতিষ্ঠানের প্রযোজ্য নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল।

কখন রিটার্ন জমা দেবেন?

আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী সাধারণ স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের জন্য সাধারণত ৩০ নভেম্বর করদিবস হিসেবে নির্ধারিত। তবে এনবিআর বিশেষ আদেশে সময়সীমা বাড়াতে পারে এবং করদাতার শ্রেণি অনুযায়ী নিয়মেও পার্থক্য থাকতে পারে।

 

মন্তব্য (০)





image

‎জাপানের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ‘নতুন সম্ভাবনা’

১

‎নিউজ ডেস্কঃ জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তান...

image

সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকি কাটিয়ে সচল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

২

‎নিউজ ডেস্কঃ সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় সাময়িকভাবে ব...

image

‎আগস্টে ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি ১২.৭১ শতাংশ বেড়েছে

৩

নিউজ ডেস্কঃ ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি গ...

image

আগস্টে ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি ১২.৭১ শতাংশ বেড়েছে

৪

নিউজ ডেস্ক : ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি ...

image

ভারত,পাকিস্তান, শ্রীলংকার তুলনায় বাংলাদেশের ঋণের হার কম

৫

নিউজ ডেস্কঃ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বাংলাদেশের সর...

  • company_logo