নিউজ ডেস্কঃ আজিয়াটা বারহাদ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিক রিজাল কামিল বলেছেন, বাংলাদেশ হচ্ছে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগের গন্তব্য। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতির পূর্বাভাস বা ধারাবাহিকতা, টেকসই শিল্প খরচ কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদে যুক্তিসঙ্গত মুনাফা অর্জনের সুযোগ থাকা আবশ্যক।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী অর্থনীতি, সুবিধাজনক জনমিতি (ডেমোগ্রাফি) এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় বাজার হিসেবে রয়েছে।’
মালয়েশিয়াভিত্তিক টেলিকম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা গ্রুপ মোবাইল অপারেটর ‘রবি’ এবং টাওয়ার কোম্পানি ‘ইডটকো’র মূল প্রতিষ্ঠান। ইডটকো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে প্রায় ৫৪ হাজার টাওয়ারের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে। গ্রুপটির দাবি, তাদের সেবার আওতায় ১৯ কোটিরও বেশি গ্রাহক রয়েছেন।
সিইও বলেন, আজিয়াটা প্রায় তিন দশক ধরে রবির মাধ্যমে বাংলাদেশে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করে আসছে। এটি দেশের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ওপর তাদের দীর্ঘমেয়াদি আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন।
একজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তাতে আজিয়াটা উৎসাহিত।
তিনি বলেন, একই সময়ে বিনিয়োগকারীদের নীতির পূর্বাভাস বা ধারাবাহিকতা, একটি টেকসই শিল্প খরচ কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদে যুক্তিসঙ্গত মুনাফা অর্জনের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতিই নির্ধারণ করবে যে ডিজিটাল অবকাঠামো বিনিয়োগের পরবর্তী ঢেউ আকৃষ্ট করতে বাজারটি কতটা কার্যকর হবে।
স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ প্রসঙ্গে নিক রিজাল কামিল বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ, তবে এটি টেলিকম অপারেটরদের অন্যতম বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রও বটে।
তিনি বলেন, একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হলে অপারেটররা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, উদ্ভাবন এবং গ্রাহক সেবা উন্নয়নে আরও বেশি মূলধন বরাদ্দ করতে সক্ষম হবে।
স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের রাজস্বের বিষয়টি বিবেচনা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে শিল্পের বিনিয়োগ সক্ষমতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
স্পেকট্রাম মূল্য নির্ধারণে আরও টেকসই পদক্ষেপ সংযোগ বাড়াতে, সেবার মান উন্নত করতে এবং সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত বিনিয়োগে সহায়তা করবে বলে মনে করেন আজিয়াটার সিইও। তিনি বলেন, এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি।
তিনি সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এ পদক্ষেপ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে সহায়তা করবে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা দেবে।
তিনি বলেন, টেলিকম খাতজুড়ে যেসব বৃহত্তর সংস্কারের কথা ভাবা হচ্ছে, তার পাশাপাশি এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার ওপর আজিয়াটার আস্থা আরও সুদৃঢ় করে।
নিক রিজাল কামিল উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা যেকোনো বাজারেই মূলত পূর্বাভাসযোগ্যতা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং আকর্ষণীয় দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা প্রত্যাশা করেন।
তিনি মনে করেন, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, কর ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করার (ইজ অব ডুইং বিজনেস) মতো ক্ষেত্রগুলোতে বৈশ্বিক সেরা চর্চাগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখলে তা প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং এ খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে।
তিনি বলেন, আমাদের বার্তা একদম সহজ- বাংলাদেশের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে এবং আমরা এর ভবিষ্যতের বিষয়ে পুরোপুরি আশাবাদী।
উল্লেখ্য, আজিয়াটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে একটি সক্রিয় সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান। এদের প্রধান বাজারগুলো হলো মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন।
তাদের মূল টেলিযোগাযোগ পোর্টফোলিওর মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়ার ‘সেলকম ডিজি’, ইন্দোনেশিয়ার ‘এক্সএলস্মার্ট’, শ্রীলঙ্কার ‘ডায়ালগ’, বাংলাদেশের ‘রবি’ এবং কম্বোডিয়ার ‘স্মার্ট’।
গ্রুপটির ডায়ালগ, রবি এবং স্মার্ট-এ সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার রয়েছে; আর সেলকম ডিজি ও এক্সএলস্মার্ট যৌথ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
রবির বিষয়ে নিক রিজাল কামিল বলেন, ডেটা ব্যবসায় বাজারপ্রধান হিসেবে অপারেটরটি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ৪জি চালুর শুরু থেকেই এর ওপর নিবিড় বিনিয়োগের ফলেই এই সফলতা অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশজুড়ে ৪জি’র কাভারেজ ও ধারণক্ষমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রবি এই শীর্ষস্থান বজায় রাখতে আগ্রহী। ৪জি হোক বা ৫জি, মূল লক্ষ্য থাকবে গ্রাহকদের জন্য ডেটার গতি বাড়ানো।
৫জি প্রসঙ্গে আজিয়াটার সিইও বলেন, বাংলাদেশ এই যাত্রায় এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অগ্রগতি হলেও ডিভাইসের সহজলভ্যতা, অ্যাপ্লিকেশন, ফাইবার অবকাঠামো এবং আকর্ষণীয় ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিতকরণসহ সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের প্রস্তুতি এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি উল্লেখ করেন, ৫জি মূলত চাহিদা ভিত্তিক হওয়া উচিত এবং এর জন্য খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আজিয়াটাকে একটি ‘স্মার্ট অ্যাসেট ম্যানেজার’ বা দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে বর্ণনা করে নিক রিজাল কামিল বলেন, সুশৃঙ্খল মূলধন বণ্টন, পরিচালনগত উৎকর্ষ, সুশাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এবং সক্রিয় পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্রুপটি মূল্যসংযোজন করে থাকে।
রবির ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো আঞ্চলিক পর্যায়ের মেধা, পরীক্ষিত পরিচালনা পদ্ধতি, এআই সক্ষমতা এবং সমগ্র এশিয়া জুড়ে সফল উদ্যোগগুলোতে সহজ প্রবেশাধিকার পাওয়া বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, আজিয়াটা গ্রুপের অভ্যন্তরে আন্তঃকোম্পানি টাস্কফোর্সগুলো এআই ভিত্তিক গ্রাহক পরিক্রমা ব্যবস্থাপনা, এআই চালিত গ্রাহক অভিজ্ঞতা, ডেটা মনিটাইজেশন এবং স্বায়ত্তশাসিত নেটওয়ার্কের মতো অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করছে। এ থেকে রবি সরাসরি উপকৃত হচ্ছে।
নিক রিজাল বলেন, রবির ডেটা খাতের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘টেককো’ (প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান) হিসেবে গড়ে তোলার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ফলে ক্লাউড, ডেটা সেন্টার এবং আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) ব্যবসার সফলতা নির্ভর করছে কোম্পানিটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে এআই ব্যবহার করছে তার ওপর।
তিনি জানান, নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা, গ্রাহক পরিষেবা, পরিচালনগত দক্ষতা এবং ব্যবসায়িক বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্রগুলোতে রবি ইতোমধ্যেই এআই প্রয়োগ করছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী টেলিযোগাযোগ খাতের বাইরেও আজিয়াটা ‘বুস্ট’, ‘এডিএ’ এবং ‘অ্যাক্সোনেক্ট’-এর মতো প্রযুক্তিভিত্তিক পোর্টফোলিও তৈরি করেছে। বুস্ট হলো গ্রুপটির ফিনটেক ও ডিজিটাল আর্থিক সেবাদানকারী ব্যবসা; যার অধীনে মালয়েশিয়ার আরএইচবি ব্যাংকিং গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত 'বুস্ট ব্যাংক' অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
‘এডিএ’ মূলত ডেটা অ্যানালিটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করে, অন্যদিকে ‘অ্যাক্সোনেক্ট’ সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সমাধান প্রদান করে থাকে।
এছাড়া গ্রুপটির অবকাঠামোগত পোর্টফোলিওর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার ‘লিংকনেট’, যা পাইকারি ফাইবার এবং ‘ফাইবার-টু-দ্য-হোম’ সংযোগ নিয়ে কাজ করে।
নিক রিজাল বলেন, ‘আজিয়াটা২৮: অ্যাডভান্সিং এশিয়া’ রূপকল্পের অধীনে গ্রাহক, দেশ ও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা তৈরির পাশাপাশি একটি শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল সংযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রবির পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করাই আজিয়াটা গ্রুপের মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, টেলিযোগাযোগ গ্রুপ থেকে একটি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় রূপান্তরের এই কৌশলে পোর্টফোলিও আধুনিকীকরণ, সুশৃঙ্খল মূলধন বণ্টন, এআই-চালিত পরিচালনগত দক্ষতা এবং অধিক মুনাফা অর্জনের ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য (০)