নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের কুমিল্লার বাসিন্দা আজফর হোসেনের দুই স্ত্রী। তবে প্রথম স্ত্রী বা তার সন্তানেরা দ্বিতীয় স্ত্রীর খবর জানতেন না। তার মৃত্যুর পর সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় এই তথ্য প্রকাশ পায়।
রাজধানী ঢাকায় চাকরি করার সময় ধানমন্ডিতে একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছিলেন আজফর হোসেন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এই ইঞ্জিনিয়ারের নিজ জেলায় যেমন রয়েছে বিপুল সম্পত্তি, তেমনি মৃত্যুর পর ঢাকার সম্পত্তির কথাও জানতে পারেন প্রথম স্ত্রী ও তার সন্তানেরা।
তবে ঢাকায় শুধু ওই একটি ভবনই নয়, বরং আজফর হোসেনের আরও ফ্ল্যাট এবং প্লটের সন্ধান পায় পরিবার।
দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে এক ছেলে রয়েছে। প্রথম স্ত্রীর তিন মেয়ে, ছেলে নেই।
২০২২ সালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আজফর হোসেন মারা যাওয়ার পর প্রথমে ধানমন্ডির বাড়ির ভাগ নিয়েই সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন তার প্রথম স্ত্রীসহ স্বজনরা।
কেননা কাগজে কলমে ওই পাঁচতলা বাড়িটি দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি ও নামজারি করা।
আজফর হোসেনের প্রথম স্ত্রী সেলিনা হোসেন জানান, মুসলিম পারিবারিক আইনানুযায়ী, যেহেতু তার ছেলে সন্তান নাই, তাই এখন মৃত স্বামীর সব সম্পত্তিতে তার তিন মেয়ের ভাগ কমে যাবে। কারণ দ্বিতীয় স্ত্রী আর তার ছেলের ভাগেও সম্পত্তির অংশ যাবে।
যে গল্পটি এতোক্ষণ পড়লেন, সেটি একটি মুসলিম পরিবারের। প্রতিবেদন বিবিসি বাংলার।
অনেকেরই হয়তো কৌতুহল হচ্ছে যে, তাহলে কোনো পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মের উত্তরাধিকার আইনে কীভাবে সম্পত্তি বণ্টন করার কথা বলা হয়েছে? স্বামীর সম্পত্তি কোন স্ত্রী কতটুকু পাবেন?
একাধিক মুসলিম বিধবা স্ত্রীর অধিকার
বাংলাদেশে মুসলিম আইনানুযায়ী, একজন পুরুষের একই সময়ে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী থাকতে পারবে। এর বেশি হলে অর্থাৎ চারজনের পরে পঞ্চম বিয়ে করলে সেই বিয়ে বাতিল হবে না, কিন্তু ‘অনিয়মিত বিয়ে’ বলে গণ্য করা হবে।
আইনজীবীরা জানান, একজন ব্যক্তি মারা যাওয়ার আগে তার সম্পত্তির ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার তৈরি হয় না।
অর্থাৎ ওই ব্যক্তি জীবিত থাকাবস্থায় নিজেই সব সম্পত্তির মালিক। তিনি জীবদ্দশায় সম্পত্তি বিক্রি বা হেবা বা দান করতে পারেন নিজের ইচ্ছায়।
মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকার তৈরি হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উজ্জল ভৌমিক বলেন, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মুসলিম একজন পুরুষের স্ত্রীর সংখ্যা স্বামীর সম্পত্তিতে তার অংশের পরিমাণকে প্রভাবিত করে।
স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর উত্তরাধিকার বন্টন নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। স্ত্রী কতজন, সন্তান আছে নাকি নেই, কতজন সন্তান, সন্তান ছেলে না মেয়ে এমন নানা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই সম্পত্তি বন্টন করা হয় বলে জানান উজ্জল ভৌমিক।
আবার কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীকে তালাক দেন, কিন্তু সেই ঘরে সন্তান থাকে তবে সেই সন্তান ওই ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে। তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী সম্পত্তির ভাগ নয়, বরং যদি পাওনা থাকে তবে দেনমোহর ও খোরপোশ পাবেন।
সন্তান থাকলে স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর ভাগ
আইনানুযায়ী, স্ত্রীর সংখ্যা এক বা একাধিক হোক, সবাই মিলে স্বামীর সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ পান।
আইনজীবী উজ্জল ভৌমিক বলেন, যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান থাকে তাহলে বিধবা স্ত্রী বা একাধিক স্ত্রীসহ সবাই মিলে স্বামীর সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ অংশ পাবেন। অর্থাৎ স্ত্রী একজন বা চারজন যতজনই থাকুক না কেন, স্বামীর সম্পত্তির আটভাগের একভাগই সবার মধ্যে বণ্টন হবে। একজন থাকলে তিনি একাই ওই অংশ পাবেন। একাধিক থাকলে সবার মধ্যে সমবণ্টন হবে বলে জানান উজ্জল ভৌমিক।
সন্তান না থাকলে সম্পত্তিতে বিধবা স্ত্রীর অংশ
যদি সন্তান না থাকে সেক্ষেত্রে একজন স্ত্রী অথবা একাধিক স্ত্রী থাকলে সবাই মিলে মৃত স্বামীর মোট সম্পত্তির চার ভাগের একভাগ অংশ পাবেন বলে জানান আইনজীবীরা।
তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী বা তার সন্তান কি সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবেন?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উজ্জল ভৌমিক জানান, যদি তালাক হয়, তবে সেই স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার বঞ্চিত হন। তবে আইনানুযায়ী, দেনমোহর এবং ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ পাবেন তিনি।
তবে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ঘরে মৃত স্বামীর ঔরসজাত সন্তান বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন।
স্বামীর সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার
বাংলাদেশে হিন্দু আইন উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সাধারণত দায়ভাগ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে, হিন্দু আইনে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অধিকার খুবই সীমিত ছিল বলে জানান আইনজীবী উজ্জল ভৌমিক। একজন হিন্দু পুরুষের একাধিক বিয়েতে বাধা নেই বলে জানান আইনজীবীরা। তবে, প্রথম স্ত্রী থাকাকালীন অন্য স্ত্রীদের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন আইনজীবীরা।
আইনজীবী উজ্জল ভৌমিক বলেন, একজন হিন্দু পুরুষ স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও একাধিক বিয়ে করতে পারবেন। কিন্তু কেবল প্রথম স্ত্রীই আইনগত বৈধতা পাবেন। দ্বিতীয় স্ত্রী স্বামীর আইনগত স্ত্রী হিসেবে কোনো স্বীকৃতি পান না। কোনো আইনি অধিকার যেমন ভরণপোষণ বা সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করতে পারবেন না।
উজ্জল ভৌমিক জানান, প্রথম বিয়ে বলবৎ থাকাবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে আইনগতভাবে অকার্যকর বলে গণ্য হবে। একইসাথে এই স্ত্রীর সন্তানরা বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু ভরণপোষণ পাওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে। একইসাথে দ্বিতীয় বিয়ের অপরাধে হিন্দু ওই পুরুষ ফৌজদারি শাস্তির অপরাধে অভিযুক্ত হতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন আইনজীবী উজ্জল ভৌমিক।
তিনি বলেন, হিন্দু পুরুষটি দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী দ্বিবিবাহের বা বাইগ্যামির অপরাধে অভিযুক্ত হবেন। হিন্দু আইনানুযায়ী, স্বামীর জীবিত থাকলে তার সম্পত্তির ওপর স্ত্রীর কোনোরকম অধিকার থাকে না। কেবল ভোগ করতে পারবেন। ওই ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর হিন্দু বিধবা একজন স্ত্রী তার এক ছেলে যে পরিমাণ সম্পত্তি পাবে, সেই সমান অংশ জীবনস্বত্ত্ব পাবেন।
অর্থাৎ, তিনি নিজের জীবদ্দশায় স্বামীর সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন, কিন্তু হস্তান্তর করতে পারবেন না। এমনকি নিজের সন্তানকেও দান করতে পারবেন না।
তবে আইনগত প্রয়োজন যেমন: স্বামীর শ্রাদ্ধ, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, দেনা পরিশোধ, নিজের ভরণপোষণ এবং সন্তান থাকলে তার ভরণপোষণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি প্রয়োজনে বিধবা হিন্দু নারী স্বামীর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন।
তিনি মারা যাওয়ার পর এই সম্পত্তি বিধবা সম্পত্তি বা উইডোজ এস্টেট হিসেবে মৃত স্বামীর পুরুষ উত্তরাধিকারের দখলে চলে যাবে বলে জানান আইনজীবীরা।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আরেকজন আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার বলেন, কোনো ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রত্যেক স্ত্রী এক পুত্র সন্তানের সমান অংশ করে সম্পত্তি জীবনস্বত্ত্বে ভোগ দখল করবেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার বলেন, যদি দশজন পুত্র থাকে তারা যে অংশটা পাবে, মাও সেই এক ছেলের সমান পাবেন।
খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মে কী বলা হয়েছে?
খ্রিস্টান ধর্মে একাধিক বা বহুবিবাহের অনুমতি নেই বলে জানান আইনজীবীরা।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলা পিডিয়ায় বলা হয়েছে, কোনো দেশীয় খ্রিস্টানের স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকলে ওই ব্যক্তি অপর কোনো দেশীয় খ্রিস্টানকে বিয়ে করতে পারে না।
আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার জানান, খ্রিস্টান আইনে দ্বিতীয় বিবাহের কোনো অনুমতিই নাই। কারণ চার্চ এটা অনুমোদন করে না।
তবে, খ্রিস্টান একজন স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্পত্তির অংশ পান। তিনি একজন ছেলের সমান ভাগ পান বলে জানান প্রশান্ত কর্মকার।
উজ্জল ভৌমিক ও প্রশান্ত কুমার কর্মকার দুইজন আইনজীবীই জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বৌদ্ধরা হিন্দু আইন অনুসরণ করে থাকে।
ফলে সেই হিসেবে একজন বৌদ্ধ পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু সম্পত্তির উত্তরাধিকার পান না প্রথম স্ত্রী ছাড়া অন্য স্ত্রীরা।
মন্তব্য (০)