গাজীপুর প্রতিনিধি : সকাল হলেই কামাল শেখের পা চলে যায় নিজের মরিচখেতে। হাতে ঝুড়ি নিয়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে খুঁজে দেখেন কোন মরিচটি তোলার মতো হয়েছে। একসময় ঝুড়ি ভরে যায় কাঁচা মরিচে। এরপর সেই মরিচ নিয়ে স্থানীয় বাজারে হাজির হন তিনি। বিক্রি শেষে হাতে আসে নগদ টাকা।
এভাবেই প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে কৃষক কামাল শেখের হিসাব।
তবে এই গল্পের সবচেয়ে বড় চমক হলো-পুরো সাফল্যের পেছনে জমি মাত্র ১০ শতক।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের চুপাইর ব্লকের ছৈলাদি গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ কামাল শেখ দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন মৌসুমে নানা ফসল আবাদ করেছেন। কিন্তু এবার কৃষি অফিসের সহযোগিতায় সুপার হট জাতের মরিচ চাষ করে তিনি পেয়েছেন ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কামাল শেখের ১০ শতক জমিতে দেওয়া হয় সুপার হট জাতের মরিচের প্রদর্শনী।
প্রথম দিকে এটি ছিল তাঁর কাছে নতুন একটি জাতের পরীক্ষা। কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে শুরু করেন চাষ। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুসরণ করেন তিনি।
কিছুদিন পর সেই জমির চেহারাই বদলে যায়। সবুজ গাছের ফাঁকে ফাঁকে দেখা দিতে থাকে মরিচ। ফলন আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে কামালের আগ্রহ।
তারপর আসে বাজারের পালা।
কাঁচা মরিচের চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় জমি থেকে সংগ্রহ করা মরিচ বিক্রি করে নিয়মিত আয় করতে শুরু করেন তিনি। অল্প জমিতে এমন ফলন ও বাজারসাড়া পেয়ে এখন তাঁর পরিকল্পনাও বড় হচ্ছে।
কামাল শেখ বলেন, “কৃষিকাজ করতে গিয়ে অনেক ফসলই করেছি, কিন্তু সুপার হট মরিচ চাষের অভিজ্ঞতা আমার জন্য আলাদা। কৃষি অফিসের পরামর্শে চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছি এবং বাজারে ভালো দামও পাচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে, একটু পরিকল্পনা করে চাষ করলে ছোট জমি থেকেও ভালো আয় করা সম্ভব। তাই আগামী বছর আরও বেশি জমিতে মরিচ চাষ করতে চাই।”
কামালের ১০ শতকের খেত এখন শুধু তাঁর নিজের আয়ের জায়গা নয়; এটি দেখে আশপাশের কৃষকরাও নতুন জাতের মরিচ চাষ নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, “কৃষকের জমিতে সফলভাবে কোনো জাতের প্রদর্শনী করা গেলে সেটি অন্য কৃষকদের জন্য বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। কামাল শেখের জমিতে সুপার হট মরিচের ফলন ভালো হয়েছে। রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যার বিষয়ে তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, এই সফলতা দেখে আরও কৃষক উন্নত জাতের মরিচ চাষে উৎসাহিত হবেন।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, উন্নত জাতের মরিচ চাষের পদ্ধতি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে কৃষকদের বাস্তব ধারণা দেওয়ার লক্ষ্যেই মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় এই প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদী বলেন, “কামাল শেখের ১০ শতক জমির সফলতা মূলত প্রদর্শনী কার্যক্রমের উদ্দেশ্যকে তুলে ধরেছে। কৃষক যদি সঠিক জাত নির্বাচন করেন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করেন, তাহলে অল্প জমিতেও ভালো ফলন ও আয় সম্ভব। বাজারে চাহিদা থাকায় সুপার হট জাতের মরিচের আবাদ সম্প্রসারণের ভালো সুযোগ রয়েছে।”
কামাল শেখের খেতে এখন প্রতিদিনই মরিচ ওঠে। প্রতিটি ঝুড়ি যেন তাঁর কাছে একেকটি আশার হিসাব।
দশ শতক জমি দিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। ফলন তাঁকে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, বাজার দিয়েছে সাহস, আর কৃষি বিভাগের সহযোগিতা দিয়েছে নতুন পথের দিশা।
তাই কামালের কাছে এই মরিচ শুধু একটি ফসল নয়-এটি ছোট জমিতে বড় স্বপ্ন দেখার গল্প।
মন্তব্য (০)