নিউজ ডেস্ক : জুলাই জাতীয় সনদকে ভিত্তি ধরে পুরো সংবিধান পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সংশোধনী সুপারিশ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সর্বসম্মত আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এই সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, এটি কেবল সংসদীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মতামতকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হবে। সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কমিটি খুব দ্রুতই জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার, আহত ও সংগ্রামী জুলাই যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধি, দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় সেশন আয়োজন করবে। একইসঙ্গে যারা এই জুলাই সনদ প্রণয়নে দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তাদের সঙ্গেও আইনগত দিকগুলো নিয়ে নিবিড় আলোচনা করা হবে, যাতে সনদটির প্রতিটি ধারাকে সাংবিধানিক আইনের সঠিক পরিভাষায় রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়।
কমিটির অবকাঠামো ও গঠন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৭ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটিতে বিএনপিসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে জুনায়েদ সাকি, ভিপি নূর, আন্দালিব রহমান পার্থের মতো সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। তবে, বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি সদস্যপদের নাম উনারা সংসদীয় বাজেট অধিবেশনের সময় দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার কথা বললেও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের যুক্ত করার আন্তরিক প্রয়াস অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও এই কমিটির পক্ষ থেকে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে যে, বিরোধী দল যখনই তাদের তালিকা প্রদান করবে, সঙ্গে সঙ্গেই তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, বিরোধী দল সরাসরি বৈঠকে না থাকলেও জুলাই সনদের মধ্যেই তাদের অধিকাংশ মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত রয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে একে ‘হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন’ বা অনুচ্ছেদগুলোর সুষম সমন্বয় বলা হয়।
ভারতের ‘কেশবসানন্দ ভারতী’ মামলার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, সাংবিধানিক আদালতের ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ বা মূল কাঠামোর নীতি অক্ষুণ্ন রেখেই এই সংশোধন আনা হবে এবং কোনো ধরনের আবেগের বশে বা রাজনৈতিক আদর্শ চাপিয়ে দিয়ে মূল সংস্কার থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই।
কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি তার বক্তব্যে এই মহৎ উদ্যোগের সময়োপযোগী গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সংবিধান কেবল কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ বা সরকারের জন্য নয়, এটি আগামী প্রজন্মের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দলিল হিসেবে কাজ করবে।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠকের কার্যক্রম শুরু করেন। কিছুক্ষণ বৈঠকে থাকার পর তিনি বেরিয়ে যান।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কমিটি শুধু নিজেদের আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করবে না। সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা সংশোধনী প্রস্তাবও প্রতিবেদনে রাখার চেষ্টা করবে। যেহেতু আমরা উদার এবং ওপেন আমরা সবার কথা শুনব। সর্বত্র যা যা সংশোধনের প্রয়োজন সে সমস্ত সংশোধনীগুলো আমরা ধারণ করে সেভাবে আমরা রিপোর্ট প্রণয়ন করব।
কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে আসবে জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, তারপরে বিল যখন আসবে সংবিধান সংশোধনী বিল পার্লামেন্টে আলোচনা করে আমরা সমযোতার ভিত্তিতে সেই সংশোধনীটা গ্রহণ করতে চাই। যেই সংশোধনী জনপ্রত্যাশা পূরণ করবে।
রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে রাখা হবে বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের এই নবযাত্রা এবং রাষ্ট্র কাঠামোর যে আমরা বিবর্তনমূলক কার্যে যাচ্ছি এবং রাষ্ট্র কাঠামোর যে গণতান্ত্রিক সংস্কার আমরা করতে চাই, সেগুলো সবগুলো আমরা এখানে অ্যাড্রেস করব, ধারণ করব, যেটা আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল আছে।
কমিটির কাজকে কোনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, কমিটির সামনে চ্যালেঞ্জ নেই। আমাদের প্রত্যাশা আছে। আমরা সবার সাথে আলোচনা করতে চাই। এটাকে আমি চ্যালেঞ্জ বলতে চাই না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আকাঙ্ক্ষাও সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় রাখার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
অন্য সদস্যরা হলেন বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি, ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন।
কমিটিতে আরও আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভোলা-১ আসনের আন্দালীব রহমান, পটুয়াখালী-৩ আসনের নুরুল হক এবং চট্টগ্রাম-৫ আসনের মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
বাকি সদস্যরা হলেন নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমিন, সংরক্ষিত মহিলা আসন-৮-এর শাকিলা ফারজানা, শেরপুর-৩ আসনের মাহমুদুল হক রুবেল এবং বরগুনা-১ আসনের মো. অলি উল্লাহ।
প্রথম বৈঠকে অলি উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন না।
কমিটিতে বর্তমানে ১২ জন সদস্য রয়েছেন। বিরোধী দল নাম দিলে আরও পাঁচজনকে যুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা যাবে।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ১২ সদস্যের এ বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
মন্তব্য (০)