নিউজ ডেস্কঃ দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসন এবং শিক্ষা খাতের নতুন চারটি প্রকল্পে ম্যানিলা-ভিত্তিক ঋণদাতা সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে প্রায় ৭৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা পেতে নিবিড়ভাবে কাজ করছে সরকার।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাসসকে জানান, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পগুলোর জন্য এডিবির সাথে আলোচনা এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
তিনি জানান, ‘বাংলাদেশ : পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই জ্বালানি উন্নয়ন ও জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন’ প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে এডিবির ১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার ঋণ আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটির ডিপিপি এখন একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা; রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানজুড়ে বাস্তবায়িত হবে। এই প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সামগ্রিক বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ করা হবে। এর মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ৬টি নতুন ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ (৩টি রাঙামাটিতে, ১টি বান্দরবানে এবং ২টি খাগড়াছড়িতে), ৪টি বিদ্যমান সাবস্টেশনের আধুনিকীকরণ এবং একটি নতুন সুইচিং স্টেশন নির্মাণ।
ইআরডি অতিরিক্ত সচিব ও এডিবি উইং প্রধান এস এম জাকারিয়া হক জানান, ‘বাংলাদেশ : ইনক্লুসিভ অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং ফাইন্যান্স প্রজেক্ট’-এর জন্য ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ‘ঢাকা শহরের আশেপাশের ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিতরণ নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের জন্য আরও ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ আলোচনা চলতি মাসেই অনুষ্ঠিত হতে পারে।
এছাড়া, বাংলাদেশে একটি বিস্তৃত শিক্ষা সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে এডিবি এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই) যৌথভাবে ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করতে যাচ্ছে।
‘বাংলাদেশ : ইনক্লুসিভ অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং ফাইন্যান্স প্রজেক্ট’ মূলত আবাসন বাজারের সেই প্রধান ঘাটতিগুলো দূর করবে, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর (বিশেষ করে নারীদের) অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাশ্রয়ী আবাসন অর্থায়নের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রকল্পে তিনটি মূল সমাধানের পরিকল্পনা করা হয়েছে: উদ্ভাবনী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সাশ্রয়ী আবাসন অর্থায়ন ব্যবস্থার জন্য একটি ক্রেডিট লাইন গঠন।
প্রস্তাবিত ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই আর্থিক মধ্যস্থতা ঋণটি পিকেএসএফ-এর মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় একটি ক্রেডিট লাইন তৈরিতে ব্যবহৃত হবে। এর মাধ্যমে যোগ্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের (এমএফআই) সহায়তায় লক্ষ্যভুক্ত নিম্ন আয়ের সুবিধাভোগীদের, বিশেষ করে নারীদের ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকার চারপাশের ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিতরণ নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত শিল্পায়িত হতে থাকা এলাকাগুলোর, বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করা। এসব এলাকায় বড় বড় কারখানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠায় বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
৪ হাজার ৯৭৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার খসড়া এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো ঢাকা সংলগ্ন শিল্পোন্নত এলাকাগুলোর শিল্প, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও গৃহস্থালির দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদা পূরণে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা জোরদার করা।
ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলার ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিজুড়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ।
এদিকে, বাংলাদেশে একটি বিস্তৃত শিক্ষা সংস্কার কর্মসূচি সহায়তায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই) ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করতে যাচ্ছে।
‘নেক্সটজেন এডুকেশন প্রোগ্রাম’ বা পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্য হলো শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক কর্মকর্তার তথ্যমতে, মোট সহায়তার মধ্যে বাংলাদেশ এডিবির কাছ থেকে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহজ শর্তে ঋণ এবং জিপিই থেকে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদান পাবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে তিনটি পৃথক প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে।
প্রস্তাবিত অর্থায়ন কাঠামো অনুযায়ী, এডিবির ঋণের ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় এবং অবশিষ্ট ৮০ মিলিয়ন ডলার কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ করা হবে। আর জিপিইর ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদান প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় হবে। মোট অনুদানের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পাবে ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ প্রত্যেকে ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে পাবে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো ডিজিটাল রূপান্তর, শিক্ষার উন্নত ফলাফল, শিক্ষক উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা।
কর্মকর্তারা জানান, নেক্সটজেন এডুকেশন প্রোগ্রামটি উন্নয়ন অর্থায়নের সাথে শিক্ষার গুণগত মান, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও দক্ষতা উন্নয়নের পরিমাপযোগ্য অগ্রগতিকে যুক্ত করে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী সংস্কার উদ্যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে এডিবি ঘোষণা করে, তারা আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেবে।
এডিবি প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দার ঢাকা সফরকালে ঘোষিত এই অর্থায়ন ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ বা সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন উদ্যোগে সহায়তা করবে, যার লক্ষ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং এর মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
মন্তব্য (০)