নিউজ ডেস্ক : নিয়মানুয়ায়ী চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের কথা।কিন্তু বাংলাদেশ আরও তিন বছর পর এলডিসি থেকে উত্তরণ চায়। এ বিষয়ে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমানের নতুন সরকার এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার চিঠিতে বেশ কিছু যুক্তি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে।
বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তেনিও ওকাম্পোর কাছে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পালটা শুল্ক আরোপ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির পরিবর্তন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাংলাদেশ অতিমাত্রায় তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই অবস্থায় অল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্য সুবিধা হারালে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উন্নয়ন গতি দুর্বল হতে পারে, এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে সরকার।
ইআরডির পাঠানো চিঠিতে আরও বলা হয়, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, শিল্পকারখানার কমপ্লায়েন্স অবকাঠামো উন্নয়নের অগ্রগতি হলেও একের পর এক সংকটের কারণে সেগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিজ, ল্যান্ডলকড ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ও স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটসবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের কার্যালয়ের করা স্বাধীন ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে অনুরোধ করেছে সরকার।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময়কাল একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে। দেশি সংকটের মধ্যে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া ইত্যাদি। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা। এসব অভিঘাতের ফলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ হ্রাস এবং কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে। এসব কারণে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময়কাল পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি, এমনটাই বলেছে সরকার।
চিঠিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়। বলা হয়, এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হবে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। চূড়ান্ত উত্তরণের আগে তৃতীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়াও চলমান।
সূত্র জানায়, সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার নেপাল ও লাওসের মতো একই সময়ে উত্তরণে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। এসংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সূত্র ধরেই তিন বছর পেছানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
মন্তব্য (০)