নিউজ ডেস্ক : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে শিবির সমর্থিত প্যানেল নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ ২১টি পদের ১৬টিতেই জিতেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’র প্রার্থীরা। বাকি পদগুলোতে ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ ও স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে জয়ী হয়েছেন। জকসুর শীর্ষ তিন পদ ছাড়া ১১টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে ৮টিতে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বাকি তিনটি পদে ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সদস্যপদে ৭টির মধ্যে পাঁচটিতে জয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের সদস্যরা। এছাড়া একটি পদে ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। অপরটিতে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
ভিপি পদে ছাত্রশিবিরের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম ৫ হাজার ৫৫৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের প্যানেলের একেএম রাকিব খান ৪ হাজার ৬৮৮ ভোট পেয়েছেন। জিএস পদে বিজয়ী ছাত্রশিবিরের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলিম আরিফ পেয়েছেন ৫ হাজার ৪৭৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের খাদিজাতুল কুবরা পেয়েছেন ২ হাজার ২৩ ভোট। এজিএস পদে বিজয়ী হয়েছেন শিবিরের মাসুদ রানা। তিনি পেয়েছেন ৫ হাজার ২০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আতিকুল ইসলাম তানজীল পেয়েছেন ৪ হাজার ২২ ভোট। তবে শিবিরের প্যানেল অদম্য জবিয়ান ঐক্যের প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে মূলত বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের। শীর্ষ দুই পদে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বিজয়ীদের ভোটের ব্যবধান বেশি। জকসুর অন্য পদগুলোয় ছাত্রদলের প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেননি। নির্বাচনের প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে জকসুর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণের একদিন পর বুধবার সকাল থেকে পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রগুলোর ফলাফল ঘোষণা শুরু হয়। বিভিন্ন কেন্দ্রের পৃথক পৃথক ফল ঘোষণা করা হয়। বুধবার রাত ১টায় প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে জকসু নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেন। ফলাফলের একপর্যায়ে ভিপি পদের প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা দিয়েছিল। পরে শিবির প্রার্থী প্রায় এক হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করেন। সারাদিন এমন চিত্রই দেখা গেছে। তবে ভোট গণনা শুরুর পরপরই অপটিক্যাল মার্ক রিডার (ওএমআর) মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। প্রায় ৬ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার রাত ১টার পর থেকে ভোট গণনা শুরু হয়। ভোটগ্রহণ শেষে দেখা গেছে, নির্বাচনে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। একমাত্র ছাত্রীহল সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ শতাংশ। মোট ৩৯টি কেন্দ্রের ১৭৮টি বুথে একযোগে এ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি এলইডি স্ক্রিনে দেখানো হয় ভোট গণনার চিত্র। শিবির সমর্থিত প্রার্থীদের এই নিরঙ্কুশ জয়কে ক্যাম্পাসে অনেকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসাবে বর্ণনা করছেন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর জকসুর প্রথম নেতৃত্ব পেল সংগঠনটি।
হল সংসদে শীর্ষ তিন পদেই অদম্য জবিয়ান ঐক্য : জবির ছাত্রীদের আবাসিক হল নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রী সংস্থা সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে এই প্যানেলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ঘোষিত ফলাফলে ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছেন জান্নাতুল উম্মি তারিন। জিএস পদে জয় পেয়েছেন সুমাইয়া তাবাসসুম এবং এজিএস পদে নির্বাচিত হয়েছেন রেদওয়ানা খাওলা।
সংগীত বিভাগের শিবিরের ভরাডুবি : জকসু নির্বাচনে সংগীত বিভাগে জিএস ও এজিএস পদে একটি ভোটও পায়নি শিবির প্যানেলের প্রার্থীরা। তবে শিবিরের ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল চারটি ভোট পেয়েছেন। এছাড়া সংগীত বিভাগে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী একেএম রাকিব ১২৫টি ভোট পেয়েছেন। আর জিএস প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা পেয়েছেন ৪৮ এবং এজিএস প্রার্থী বিএম আতিকুর রহমান তানজিল পেয়েছেন ১০৮ ভোট। সংগীত বিভাগের ২৩৮ ভোটারের মধ্যে ১৪৬টি ভোট পড়ে।
ভোটের ফল ঘোষণা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান বলেন, আজ যারা জয়ী হয়েছে তাদের অভিনন্দন। যারা জয়ী হয়নি, তাদের জন্যও শুভকামনা। সাংবাদিক, শিক্ষকসহ সবাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করেছে। এজন্য সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
নির্বাচন কমিশন জানায়, ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কারিগরি জটিলতা ও দীর্ঘ বিরতির পরও সব পক্ষের উপস্থিতিতে ওএমআর মেশিন ও হাতে গণনার সমন্বয়ে ফলাফল নির্ধারণ করা হয়। ফলাফল ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিজয়ী প্যানেলের সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও পরাজিত পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের অনেককে নীরব থাকতে দেখা যায়।
ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক পদে মো. নুরনবী (৫ হাজার ৪০০ ভোট), শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক ইব্রাহীম খলিল (৫ হাজার ৫২৪ ভোট), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক মোছা. সুখীমন খাতুন (৪ হাজার ৪৮৬ ভোট), স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ (৪ হাজার ৪৭০ ভোট), আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক হাবীব মোহাম্মদ ফারুক (৪ হাজার ৬৫৪ ভোট), আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নওশীন নাওয়ার (৪ হাজার ৪০১ ভোট), ক্রীড়া সম্পাদক পদে জর্জিস আনোয়ার নাইম (২ হাজার ৪৬৭ ভোট) এবং সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদে মোস্তাফিজুর রহমান (৩ হাজার ৪৮৬ ভোট) জয়ী হয়েছেন। ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল জয় পেয়েছে তিনটি সম্পাদকীয় পদে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে তাকরিম মিয়া ৫ হাজার ৩৮৫ ভোট, পরিবহণ সম্পাদক পদে মাহিদ হোসেন ৪ হাজার ২৩ ভোট এবং পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদে মো. রিয়াসাল রাকিব ৪ হাজার ৬৯৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।
কার্যনির্বাহী সদস্যের ৭টি পদের মধ্যে শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে বিজয়ী হয়েছেন পাঁচজন। সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন শিবির সমর্থিত প্যানেলের ফাতেমা আক্তার (অওরিন), ৩,৮৫১ ভোট। একই প্যানেলের আকিব হাসান ৩,৫৮৮ ভোট, শান্তা আক্তার ৩,৫৫৪ ভোট, জাহিদ হাসান ৩,১২৪ ভোট ও মো. আব্দুল্লাহ আল ফারুক ২,৯১৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এছাড়া ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলে দুজন বিজয়ী হয়েছেন। তারা হলেন মোহাম্মদ সাদমান আমিন (৩,৩০৭ ভোট), ইমরান হাসান ইমন (২,৬৩৬ ভোট)।
ফলাফল ঘোষণা শেষে নবনির্বাচিত ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, আপনারা আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। আমিও মানুষ। আমি নিজে ভুলের ঊর্ধ্বে নই। আমি ভুল করলে আপনারা আমাকে শুধরে দেবেন।
এবার কেন্দ্রীয় সংসদে অংশ নেওয়া চারটি প্যানেলের মধ্যে-ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’, ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’, ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ ও বামপন্থি জোটের সমর্থিত ‘মওলানা ভাসানী ব্রিগেড’ প্যানেল। এসব প্যানেল ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচন করেছেন।
মন্তব্য (০)