নিউজ ডেস্কঃ বাসাবাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আয়ের সুযোগ দিচ্ছে সরকার। এ জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে প্রণোদনা পাওয়া যাবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া এ কর্মসূচির আওতায় গ্রাহকেরা ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে নিজেরাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার করতে পারবেন। নেট মিটারিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে নির্ধারিত হারে এ অর্থ পাওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলে পরবর্তী তিন বছর প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে প্রণোদনা পাওয়া যাবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এ সুবিধা কার্যকর থাকবে।
উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে প্রাপ্য অর্থ প্রতি তিন মাস পরপর গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই নগদ অর্থ পরিশোধ করবে না বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের আগে গ্রাহকেরা বিদ্যুৎ বিভাগের রুফটপ সোলার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে সম্ভাব্য উৎপাদন ও খরচ-লাভের হিসাব জানতে পারবেন। ছাদের মোট আয়তন ও ব্যবহারযোগ্য জায়গার তথ্য দিলে ক্যালকুলেটর সম্ভাব্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষমতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব দেবে। এর মাধ্যমে ভবনের বিদ্যুৎ চাহিদার কতটা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের ক্যালকুলেটরের উদাহরণ অনুযায়ী, ২ হাজার বর্গফুটের একটি আবাসিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে মাসে গড়ে ১ হাজার ৮৩৩ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ হিসাবে বছরে মোট উৎপাদন হতে পারে প্রায় ২১ হাজার ৯৯৬ ইউনিট।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে গ্রাহকেরা তালিকাভুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানির সহায়তা নিতে পারবেন। এসব প্রতিষ্ঠান ছাদের উপযোগিতা যাচাই, সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করবে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যাটারি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলেও প্রয়োজনের সময় সংরক্ষিত বিদ্যুৎ ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তবে এ সুবিধার জন্য সৌর প্যানেলের পাশাপাশি ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম স্থাপনের প্রয়োজন হবে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও মিটারসহ সংশ্লিষ্ট সব যন্ত্রপাতি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে।
নেট মিটারিং ব্যবস্থায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ প্রথমে গ্রাহকের নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দ্বিমুখী মিটারের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। গ্রিড থেকে নেওয়া বিদ্যুৎ ও গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের হিসাব সমন্বয় করা হয়। উৎপাদন ব্যবহারের চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে নির্ধারিত নিয়মে গ্রাহক অর্থ পাবে।
এ সংক্রান্ত নীতিগত ও কারিগরি সহায়তা দিতে বিদ্যুৎ বিভাগ ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার স্থাপন করেছে। এছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কার্যালয় থেকেও গ্রাহকেরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্প স্থাপনের সুযোগ রেখে গত ১৯ অক্টোবর ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ- ২০২৬’ জারি করেছে সরকার।
এ অধ্যাদেশের আওতায় সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সরকারি কোম্পানি এবং বাসাবাড়ির ছাদ, আঙিনা, পরিত্যক্ত জমি, জলাশয় ও চা বাগানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। এছাড়া ভবন, পার্কিং লট, গ্যারেজ, বাণিজ্যিক ও শিল্প স্থাপনার ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা ওপেক্স (অপারেটিং এক্সপেন্ডিচার) মডেলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে ব্যবসা করতে পারবেন। এ মডেলে বিনিয়োগকারী নিজ খরচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনা করবেন এবং চুক্তি অনুযায়ী গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মূল্য পরিশোধ করবেন। অন্যদিকে, নিজস্ব তহবিল থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাপেক্স (ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার) মডেলে নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবে।
সময় সাশ্রয়ে নির্দিষ্ট শর্তে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ইজিপি) পদ্ধতি বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুরক্ষায় অধ্যাদেশে বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরি, চোরাই পণ্য কেনাবেচা কিংবা হেফাজতে রাখার অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
সৌর প্যানেল বা যন্ত্রাংশ ভাঙচুর কিংবা ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া অবৈধ সংযোগ স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের বাধা দেওয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ জনপ্রিয় করতে হবে। এ উদ্যোগ সফল করতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, প্রয়োজনে প্রণোদনার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং মেয়াদ শেষের পর সরকার সেই বিদ্যুৎ কিভাবে কিনবে তা ঘোষণা করা উচিত। একই সঙ্গে নেট মিটারিং সংযোগের জটিলতা দূর করতে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে এক মাসের মধ্যে নেট মিটারিং নিশ্চিত করতে হবে।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে আয় করার সুযোগ দেওয়া সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগের সুফল পেতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে তিন বছরের প্রণোদনার মেয়াদ আরও বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি নেট মিটারিং সংযোগ পেতে যে জটিলতা রয়েছে, তা দূর করতে হবে।
হাসান মেহেদী বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়ে এক মাসের মধ্যে নেট মিটারিং নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ কার্যকর হবে। অন্যথায় সরকারের এ কর্মসূচি প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এ কারণে সরকার বাসাবাড়ি, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাঁর বাসভবনের ছাদে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছেন।
গত ৩ অক্টোবর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন দিনে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন এবং ১ হাজার ২০০ ইউনিট জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেছেন।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে আয় করার সুযোগ থাকায় এ কর্মসূচিতে সাধারণ গ্রাহকদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।
মন্তব্য (০)