নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের সমন্বিত স্বাস্থ্য তথ্যভাণ্ডার সুরক্ষা ও গবেষণায় কাজে লাগাতে এবং 'ই-হেলথ কার্ড' বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে এক জাতীয় হ্যাকাথনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটাল রূপান্তরে তৃণমূলের তরুণ উদ্ভাবকদের মেধা ও নতুন আইডিয়া তুলে আনতেই এই বিশেষ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অংশীদারত্বে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এ কর্মসূচির বিস্তারিত রূপরেখা ঘোষণা করেন। সেখানে আরো বক্তব্য দেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
হ্যাকাথনের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা যখন দায়িত্ব নেওয়ার পর ই-হেলথ কার্ড নিয়ে কাজ শুরু করি, তখন অনেকেই আলাদাভাবে নানা চমৎকার আইডিয়া নিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে স্বাস্থ্য খাতের একেকটি উদ্যোগ আলাদা ‘সাইলো’ বা গণ্ডিতে আটকে থাকে, যা পরবর্তীতে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডিজিটাল সিস্টেমে প্রতিটি বিভাগ যেন পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হতে পারে (ইন্টারঅপারেবিলিটি), সে লক্ষ্যেই এই হ্যাকাথনের মাধ্যমে সবাইকে একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ প্ল্যাটফর্মে আনা হচ্ছে।”
আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুহিত আরও বলেন, “একবার কল্পনা করুন—২০ কোটি মানুষের একটি বিশাল স্বাস্থ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হচ্ছে। একজন নাগরিক যতবার চিকিৎসকের কাছে যাবেন, যতবার ডিসপেনসারি থেকে ওষুধ কিনবেন কিংবা ল্যাব টেস্ট করাবেন—সব মেডিকেল রেকর্ড সেখানে নিয়মিত যুক্ত হতে থাকবে। এই বিপুল ডেটাসেট নিজেই স্বাস্থ্য গবেষণার এক বিশাল রিসোর্স। বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোও এ ধরনের ডেটাবেসে বিনিয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেশিন লার্নিং মডেলে ব্যবহারের আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং তথ্যের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা (ডেটা সিকিউরিটি) নিশ্চিত করেই এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।”
হ্যাকাথনের অংশগ্রহণ ও পরবর্তী ধাপের বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, কোনো তরুণের উদ্ভাবনী মেধা যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্যই এই জাতীয় উদ্যোগ। আগামী এক মাসব্যাপী এই হ্যাকাথনের নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালু থাকবে। দেশের সব প্রান্তের তরুণ উদ্ভাবকদের স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল সমাধানের আইডিয়া নিয়ে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নিবন্ধন ও বাছাই পর্ব শেষে নির্বাচিত দলগুলোকে নিয়ে রাজধানী ঢাকায় তিন দিনব্যাপী একটি নিবিড় 'বুটক্যাম্প' অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে দেশি ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সরাসরি তরুণদের মেন্টরশিপ প্রদান করবেন, যাতে তাদের প্রাথমিক ধারণাগুলো টেকসই ও কার্যকর বাস্তব রূপ পায়।
বক্তব্যে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, “সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে তদবির বা নেপোটিজমের সুযোগ বন্ধ করে সবার জন্য সমান সুযোগ ও স্বচ্ছতা তৈরিতে এমন উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা দারুণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক তরুণের সেরা উদ্ভাবনী ভাবনাও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।”
আশিক চৌধুরী বলেন, “বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত আনুমানিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বাজার, যা সঠিক তথ্যের অভাবে এখনও পুরোপুরি মূল্যায়িত হয়নি। স্বাস্থ্য খাত ডিজিটালাইজড হলে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে দেশি-বিদেশি বড় বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে।”
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. রাজেশ নারওয়াল, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক দিল আফরোজা, ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. মালালয় আহমাদজাই, এডিএন টেলিকম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের পরিচালক ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেননুর এবং বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অপারেশনস অফিসার ইফফাত মাহমুদ। অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য দেন ইন্টারস্পিড অ্যাডভার্টাইজিং লিমিটেডের গ্রুপ ডিরেক্টর আদনান করিম ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্বাসতন্ত্রের রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মানাল মিজানুর রহমান।
মন্তব্য (০)