নিউজ ডেস্ক : ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম, কিন্তু মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে। দাম্পত্য জীবনে মানিয়ে নিতে না পারা এবং একপর্যায়ে হতাশা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়েন ২৮ বছর বয়সি এক তরুণী। ইয়াবা দিয়ে শুরু হওয়া সেই আসক্তি শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে গেছে মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে। তার মতোই নানা পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক সংকটে পড়ে শিক্ষিত ও স্বচ্ছল পরিবারের অনেক তরুণীও এখন মাদকের ভয়াল ছোবলে আক্রান্ত হচ্ছেন।
নারকোটিক্সের সম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ বছরে শুধু সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ৩ হাজার ১০৬ জন নারী মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সাধারণত ছিন্নমূল এবং হতদরিদ্র নারীদের একটি বড় অংশ সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হন। উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত নারীদের বেশির ভাগই ভর্তি হন বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীদের মাদকাসক্তি পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগের। কারণ নারী গর্ভধারণ করেন। ফলে মাদকাসক্তির প্রভাবে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বা বিকলঙ্গ শিশু জন্ম নিতে পারে। এছাড়া নারীদের ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ বেশ কম। সামাজিক কারণেও নারীদের অনেকে মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে রাজি হন না।
বেসরকারি সংস্থা আহ্ছানিয়া মিশন রাজধানীর শ্যামলীতে ৪০ শয্যাবিশিষ্ট একটি নারী মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনা করে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩১ জন। এদের মধ্যে ২০ জনই ইয়াবা আসক্ত। চিকিৎসাধীনদের ১২ জন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, চারজন গৃহিণী, দুজন ব্যবসায়ী, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১১ জন বেকার।
সম্প্রতি সেখানে গেলে চিকিৎসাধীন ২৮ বছর বয়সি এক তরুণী যুগান্তরের কাছে তার মাদকে জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ধনাঢ্য পরিবারে তার জন্ম। কিন্তু দাম্পত্য বিরোধে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে দেওয়া হয়। এর পরের বছরই তিনি সন্তান জন্ম দেন। তবে ৩ গুণ বেশি বয়সি স্বামীর সঙ্গে তিনি সেভাবে মানিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে জীবনের প্রতি এক ধরনের হতাশা থেকে তিনি ধীরে ধীরে মাদকের দিকে হাত বাড়ান।
সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিজেই দেখেছেন স্কুল পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীও নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে ইয়াবা। পাড়া-মহল্লায় অবাধে মাদক বিক্রি হচ্ছে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তিনি বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল ছেড়ে নতুন বাজার এলাকায় সান ফ্লাওয়ার নামের একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের অনেককেই তিনি ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকাসক্ত তরুণীদের একটি বড় অংশ ইয়াবা এবং গাঁজাসেবী। বিশেষ করে ইয়াবা সেবন নিয়ে নারীদের মধ্যে একটি মারাত্মক ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যবান কিংবা মোটা তরুণীদের অনেকে চিকন বা পাতলা হওয়ার জন্য ইয়াবা সেবন করে থাকেন। অথচ বাস্তবে ইয়াবা আসক্তির ফলে ক্ষুধামন্দা থেকে সাময়িক ওজন হ্রাস পেলেও দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ্যত্বসহ বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়।
মাদকাসক্তির চিকিৎসায় আহ্ছানিয়া মিশনের নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী এক নারী চিকিৎসক। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘ সময় আইসিউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এ সময় টানা কয়েক মাস ধরে তাকে ব্যথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়। কিন্তু পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও তিনি ব্যথানাশকের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, ঘটনাক্রমে মাদকের প্রতি তার আসক্তি তৈরি হলেও বাস্তবে চিকিৎসকদের কেউ কেউ অনেক সময় প্রচণ্ড পেশাগত চাপের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কেউবা পদোন্নতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ভয়ে কিংবা হতাশা থেকেও মাদক নিয়ে থাকেন। তবে চিকিৎসকদের মধ্যে কেউ সাময়িকভাবে মাদকে জড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হন।
মন্তব্য (০)