নিউজ ডেস্ক : ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধকালীন অবরোধের মধ্যে পড়ে তিন ভারতীয় নাবিকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে ভারতজুড়ে তীব্র গণঅসন্তুষ্টি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনা ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যকার ইতোমধ্যে টানাপোড়েনে থাকা কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
ওমান সাগরে বাণিজ্যিক তেল ট্যাঙ্কারে মার্কিন বিমান হামলায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ভারতীয় নাগরিকদের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত শিকার’ (কলাটেরাল ড্যামেজ) হওয়ার আশঙ্কাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
গত বুধবার (১০ জুন) সকালে ওমান সাগর অতিক্রম করার সময় পালাউয়ের পতাকাবাহী ‘এম/টি সেত্তেবেলো’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় মার্কিন বিমান বাহিনী। ইরানি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে এই হামলা চালানো হলে মুহূর্তেই সেখানে আগুন ধরে যায় এবং চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। পরবর্তীতে উদ্ধার অভিযান চালানো হলেও তিন ভারতীয় নাবিককে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর জারিকৃত অবরোধের নির্দেশনা বারবার অমান্য করায় জাহাজটিকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে মার্কিন-ইসরাইল বনাম ইরান সংঘাতের মাঝে নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি এই ঘটনার পর কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে এবং মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট জানিয়েছেন যে বাণিজ্যিক জাহাজে এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ হতে হবে।
এই ঘটনাটি এমন এক সংবেদনশীল সময়ে ঘটল, যার মাত্র কয়েক দিন পরেই ফ্রান্সের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এখন প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যেন তিনি এই হামলার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেন।
‘সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন্স’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় যখন ভারতীয় শ্রমিকদের হত্যা করা হয়, তখন ভারত সরকারকে অবশ্যই উচ্চকণ্ঠে এবং দৃঢ়ভাবে কথা বলতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বকে মোদি যেভাবে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করে এসেছেন, ভারতীয় নাগরিকদের জীবন রক্ষায় সেই সম্পর্কের কার্যকারিতা এখন এক বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
সমুদ্রসীমায় ভারতীয় নাবিকদের ওপর এমন আগ্রাসন অবশ্য এটাই প্রথম নয়। এর মাত্র একদিন আগে ওমান উপসাগরে মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ‘এম/টি মারিভেক্স’ নামের আরেকটি ট্যাঙ্কার থেকে ২৪ জন ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করা হয়। এর পরদিনই ‘এম/টি জলবীর’ নামের আরেকটি জাহাজেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়, যেখানে কর্মরত ভারতীয় ক্রুরা ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
বিশ্বজুড়ে মার্চেন্ট ম্যারিন লেবারের অন্যতম প্রধান জোগানদাতা হিসেবে ভারতের প্রায় ৩ লাখের বেশি নাবিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাহাজে কাজ করেন। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলে কর্মরত হাজার হাজার ভারতীয় নাবিক এখন চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিখোঁজ ও নিহতদের পরিবারগুলো এখন প্রিয়জনদের শেষ মুহূর্তের জবাবদিহিতা এবং মরদেহ ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ঘটনা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন করে সংকটে ফেলেছে। গত এক বছরে কাশ্মীরে মধ্যস্থতা নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য, ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে দুই দেশের দূরত্ব বেড়েই চলছিল। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক নয়াদিল্লি সফর এবং নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মাধ্যমে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা চলছিল, কিন্তু ভারতীয় নাবিকদের এই হত্যাকাণ্ড সেই প্রচেষ্টাকে অনেকটাই ভেস্তে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ জনক্ষোভ প্রশমিত করতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অন্তত একটি আনুষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ বা দুঃখ প্রকাশমূলক বার্তা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সামরিক ও কৌশলগত চুক্তিগুলো ধরে রাখা নয়াদিল্লির জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্র: সিএনএন।
মন্তব্য (০)