রংপুর ব্যুরো : রংপুরের পীরগাছা উপজেলার একটি গ্রামের সকালটি ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক।ঈদকে ঘিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ছিল শিশু-কিশোররা। কিন্তু সেই আনন্দ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিণত হয় গভীর শোকে।বাড়ির পাশের একটি ডোবার পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে দুই শিশু। একসঙ্গে খেলতে বের হওয়া দুই শিশুর নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা, শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়।
বুধবার (৩ জুন) দুপুরে পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের দিঘটারী গ্রামে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুরা হলো দিঘটারী গ্রামের সামছুল হকের ছেলে মাহামুদুল হাসান (৫) এবং তার ফুফাতো ভাই সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চাচিয়া মীরগঞ্জ গ্রামের জাহিদ হোসেনের ছেলে আবিদ হাসান (৫)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈদ উপলক্ষে কয়েকদিন আগে আবিদ হাসান তার নানাবাড়িতে বেড়াতে আসে। বুধবার সকাল ১০টার দিকে মাহামুদুল ও আবিদ একসঙ্গে বাড়ি থেকে খেলতে বের হয়।দীর্ঘ সময় পার হলেও তারা বাড়িতে ফিরে না আসায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের নিয়ে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর দুপুরের দিকে বাড়ির পাশের একটি ডোবায় দুই শিশুর মরদেহ ভাসতে দেখতে পান স্থানীয় কয়েকজন। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। সন্তানদের নিথর দেহ দেখে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।
নিহত মাহামুদুলের বাবা সামছুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সকালে দুই শিশু একসঙ্গে খেলতে বের হয়েছিল। অনেকক্ষণ তাদের দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। পরে শুনি ডোবায় তাদের মরদেহ পাওয়া গেছে। আমার বুকের ধনটাকে আর ফিরে পাব না। এই শোক আমি কীভাবে সইব?”
আবিদের নানী অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “ঈদের আনন্দ করতে নাতিটা বেড়াতে এসেছিল। কে জানত এভাবেই তাকে হারাতে হবে। সকালেও কোলে নিয়েছি, দুপুরে তার লাশ দেখতে হবে-এ কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “একই দিনে দুটি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু পুরো গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বাড়ির আশপাশের অরক্ষিত ডোবা ও জলাশয় শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি। এগুলো নিরাপদ করার উদ্যোগ জরুরি।”
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সচেতনতার অভাব এবং অরক্ষিত জলাশয়ের কারণে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। এই ঘটনা আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে।”
এদিকে শিশুদের করুণ মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশের জলাশয় ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শিশুদের প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় ঘিরে রাখা এবং পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতাই এমন দুর্ঘটনা কমাতে পারে। তাদের দাবি, প্রতিটি পরিবারকে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
একই দিনে দুই শিশুর এমন করুণ মৃত্যুতে দিঘটারী গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। যে দুই শিশু সকালে খেলতে বের হয়েছিল, বিকেলে তাদের ফিরতে হয়েছে নিথর দেহ হয়ে। স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারি যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে-এক মুহূর্তের অসতর্কতায় ঝরে যেতে পারে অমূল্য দুটি প্রাণ, যার শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
খবর পেয়ে পীরগাছা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহায়তায় মরদেহ উদ্ধার করে। পরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম খন্দকার মুহিব্বুল বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মন্তব্য (০)