নওগাঁ প্রতিনিধি: শেষ সময়ে জমে উঠেছে নওগাঁর প্রতিটি কোরবানীর পশুর হাট। ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারনা আর হাক-ডাকে মুখর হয়ে উঠেছে হাটগুলো। কিন্তু হাটে ক্রেতা আর বিক্রেতার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এবার প্রতিটি হাটে ক্রেতার চেয়ে পশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় দাম অনেকটাই হাতের নাগালে রয়েছে। আবার দাম কম হওয়ায় ক্রেতাদের মুখে হাসি দেখা গেলেও লালন-পালন করা পশু লোকসান দিয়ে বিক্রি করে বিক্রেতারা মলিন মুখে বাড়ি ফিরছেন।
এদিকে গবাদিপশু লালন-পালনের সকল উপকরণের দাম বৃদ্ধি হওয়ার কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে ছোট ছোট খামারীদের। অনেকেই হাট না ঘুরে কিছুটা কম দামেই পশু বিক্রি করছেন। আবার শেষ সময়ে এসে ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে গরু বাংলাদেশে আসার কারণে দেশীয় গবাদিপশুর দাম না পাওয়ার আশঙ্কা করছেন নওগাঁর প্রান্তিক পর্যায়ের খামারীরা। আবার হাট ইজাদাররা বলছেন শেষের দিকে যখন হাটে ক্রেতাদের আগমন আরো বেশি হবে তখন পশুর দাম কিছুটা বেশি হবে। এছাড়া হাটগুলোতে জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া হাসিল আদায় করা হচ্ছে কিনা সেই বিষয়টি কঠোর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত টিম। জেলার পশুর হাটগুলোতে জেলা প্রশাসনের এমন জনহিতকর কার্যক্রমে স্বস্তি প্রকাশ করেছে হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতা, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খামারীরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ডা: গৌরাঙ্গ কুমার তালুকদার জানান কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জেলার ১১টি উপজেলার ছোট-বড় ও প্রান্তিক পর্যায়ের ৩৮হাজার ৯শত ৯জন খামারীরা তাদের গবাদিপশু প্রস্তুত করেছেন। প্রতিটি খামারীদের প্রাকৃতিক উপায়ে গবাদিপশু বড় করার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া গবাদিপশু লালন-পালনের কার্যক্রম কঠোর ভাবে পর্যবেক্ষন করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন খামারে ২লাখ গরু, ৫লাখ ১৪হাজার ছাগল, ৮০হাজার ভেড়া ও ২হাজার মহিষ প্রস্তুত করা হয়েছে যা বর্তমানে হাটে বিক্রি করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রতিটি হাটে গবাদিপশু পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চলতি বছর নওগাঁয় কুরবানীর জন্য বিভিন্ন গবাদিপশুর চাহিদা রয়েছে ৩লাখ ৮৬হাজার আর অতিরিক্ত গবাদিপশু রয়েছে ৪লাখ ১০হাজার যে গবাদিপশুগুলো নওগাঁর খামারীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান করে লাভবান হতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান জেলার ১১টি উপজেলায় স্থায়ী আর অস্থায়ী ছোট-বড় মিলে প্রায় দুই শতাধিক হাটে কোরবানীর পশু ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। প্রতিটি হাটে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হাসিল হিসেবে ক্রেতার কাছ থেকে গরু/মহিষ/ঘোড়া প্রতিটি অনুমোদিত টোল রেইট ৭শত এবং খাসি/ছাগল/ভেড়া প্রভৃতি প্রতিটির জন্য ৩শত টাকা আদায় করা হচ্ছে কিনা সেই বিষয়টি ভ্রাম্যমাণ আদালত কঠোর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রতিটি হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের সচেতন করার লক্ষ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং প্রচার কাজ চলমান রাখা হয়েছে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে নিরাপদ ও স্বচ্ছ পশুর হাট নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে পশু কেনাবেচা করতে পারেন, সেদিকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ নজর রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এমন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানান এই কর্মকর্তা।
তিনি আরো জানান গত ১৮ মে হতে সোমবার (২৫মে) পর্যন্ত পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন উপজেলার কোরবানির পশুর হাটে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করাসহ বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৪৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ০৮টি মামলার মাধ্যমে ১,১৫,৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিটি হাটেই প্রতিদিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রকাশ্য স্থানে হাসিল আদায়ের মূল্য তালিকা টানানো ও নির্ধারিত মূল্যের বেশি হাসিল আদায় প্রতিরোধে কঠোর মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত আছে। এছাড়া জাল নোট প্রতিরোধে প্রতি হাটেই ব্যাংকের বুথ স্থাপনের মাধ্যমে সেবা প্রদানের কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। সকল শ্রেণিপেশার মানুষের সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে বড় ধরণের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই জেলা এবং জেলার বাহিরের মানুষরা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে গবাদিপশু ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম শেষ করতে পারবেন বলে জেলা প্রশাসক দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান নওগাঁর প্রতিটি পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া সাদা পোষাকেও পুলিশ সদস্যরা হাটের নিরাপত্তা প্রদান কাজে নিয়োজিত রয়েছে। হাটে পকেটমার থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আটক করতে জেলা গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা হাটগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া জেলার বাহির থেকে আসা ক্রেতাদের নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে দিনে এবং রাতে অতিরিক্ত টহল পুলিশ নিয়োজিত রেখে সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনগুলোতে তল্লাসী করার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। এছাড়া ভারতীয় পশু যেন নওগাঁর হাটগুলোতে প্রবেশ করতে না পারে সেই বিষয়টি বিজিবির সঙ্গে জেলা পুলিশও কঠোর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জেলায় গবাদিপশু ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।
মন্তব্য (০)