নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে চুক্তির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবার ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) তৃতীয় দিন ৮ ঘণ্টা কর্মবিরতি চলাকালে নতুন কর্মসূচির ডাক দেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। তারা বলছেন, সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক স্থাপনা বিদেশিদের (ডিপি ওয়ার্ল্ডের) হাতে তুলে দিয়ে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছে। দেশের স্বার্থ রক্ষায় যখন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে নেমেছে তখন তাদের সঙ্গে আলোচনার পরিবর্তে কর্মচারীদের বদলিসহ নানা হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার।
প্রতিহিংসামূলক ও স্বৈরাচারী এই আচরণে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও দানা বাঁধছে। শনি ও রোববার দুই দফায় চট্টগ্রাম বন্দরের ১৬ জন কর্মচারীকে পানগাঁও ও কমলাপুর আইসিডিতে বদলি করা হয়েছিল। সোমবার মন্ত্রণালয়ের নতুন এক আদেশে তাদের মধ্যে ১৫ জনকে বদলি করে মোংলা ও পায়রা বন্দরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, মোংলা ও পায়রা বন্দর আলাদা প্রতিষ্ঠান। সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মচারীদের এই দুই বন্দরে পাঠানোর সুযোগ নেই। তবে যেখানেই বদলি করা হোক এ পর্যন্ত কোনো কর্মচারী নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার সংকল্প করেছেন তারা।
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকার ও আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের এ ধরনের আন্দোলনে যাওয়া ঠিক হয়নি। এতে ‘মহলবিশেষের ইন্ধন’ রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে টানা তিন দিনের কর্মবিরতি তথা ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। কোনো ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং না হওয়ায় বিভিন্ন ইয়ার্ডে সৃষ্টি হয়েছে কনটেইনারের জট। কেবল রোজার পণ্যসহ জরুরি পণ্য নিয়ে বন্দরের বহির্নোঙ্গরে ভাসছে ৩৫টি মাদার ভেসেল। লাইটার থেকেও পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না।
একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন যেসব বেসরকারি ডিপো বা অফডক রয়েছে সেসব অফডকেও অপারেশনাল কার্যক্রমে মারাÍক ধীরগতি সৃষ্টি হয়েছে। কর্মচারীদের নতুন করে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি কর্মসূচি ঘোষণার কারণে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তারা বলছেন, আমদানি-রপ্তানির বেশির ভাগ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। দেশের অর্থনীতির প্রাণ চট্টগ্রাম বন্দর যে কোনো মূল্যে সচল রাখতে হবে। সেটা আলোচনার ভিত্তিতে হোক কিংবা অন্য যেকোনো উপায়ে হোক। টানা তিন দিনের কর্মবিরতির কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে তা টাকার অঙ্কে হিসাব করা কঠিন।
সোমবার সকালে দাবি আদায়ে কালোপতাকা মিছিল করেছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-স্কপ। বন্দরের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে কালো হরফে লেখা ‘কর্মবিরতি’ চলছে স্টিকার। স্কপের সমাবেশ থেকে বন্দর চেয়ারম্যান ও বিডা চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করা হয়। কর্মচারীদের কর্মবিরতি বা ধর্মঘটের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও।
সকালে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) ব্যানারে আগ্রাবাদ চৌমুহনি থেকে কালোপতাকা মিছিল বের হয়। ‘এনসিটি ইজারা দেওয়ার দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির প্রক্রিয়া বন্ধ করো’ শীর্ষক কালোপতাকা ও ব্যানার নিয়ে মিছিলটি বারিক বিল্ডিং মোড়ে গেলে আটকে দেয় পুলিশ। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ বন্দর ভবন চত্বরে দুপুর ১টার দিকে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে আজ (মঙ্গলবার) সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতির নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। পাশপাশি সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
কর্মবিরতি চলাকালে দেখা গেছে, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্দরের কোনো ইয়ার্ডে অপারেশনাল বা প্রশাসনিক কোনো কার্যক্রম হয়নি। শ্রমিক-কর্মচারীরা অফিসে উপস্থিত হলেও কাজ করা থেকে বিরত থাকেন। বন্দরের ভেতরে-বাইরে ছিল না ট্রাক-লরির চলাচল।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও বন্দরের নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার (১ম শ্রেণী) মো. ইব্রাহিম খোকন যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এনসিটি বিদেশিদের না দেওয়ার জন্য এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন শ্রমিক কর্মচারীরা। কিন্তু সরকার তাদের দাবির প্রতি কোনো তোয়াক্কা না করে চুক্তির প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ আছে আর মাত্র ৯ দিন। এরপরও এনসিটি দিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে তাদের কী স্বার্থ লুকিয়ে আছে তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা এতে অত্যক্ষ ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই সবাই স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে আন্দোলনে নেমেছেন। তিনি বলেন, বন্দর তথা সরকার শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার পরিবর্তে অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দেখাচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকরা এতে ভীত নয়। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৭ হাজার কনটেইনার জমেছিল। রোববার কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছিল এক হাজার ৬৮৪ টিইইইউএস কনটেইনার। সোমবার এক হাজার ৫৮৭ টিইইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হওয়ার কথা। ৮ ঘণ্টা কর্মবিরতির পর যে সময়টা ছিল সেই সময়ে এই ডেলিভারি। তবে স্বাভাবিক সময়ে এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি ডেলিভারি হয়।
অফডক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোটস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) সচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব যুগান্তরকে বলেন, বন্দরে কর্মবিরতির ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অফডকেও। অফডকে কনটেইনারের জট লেগে যাচ্ছে। রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে না পারায় পোশাক শিল্পের বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের উচিত যে কোনো মূল্যে বন্দর সচল করা। না হয় পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তা সামাল দেওয়া আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
মন্তব্য (০)