নিজস্ব সংবাদদাতা
অভিবাসন সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগের আওতায় স্পেন প্রায় ২০,০০০ অনিবন্ধিত বাংলাদেশি অভিবাসীর আইনি মর্যাদা নিয়মিত করতে যাচ্ছে। ঢাকা, মাদ্রিদ ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
স্প্যানিশ সরকার সম্প্রতি অনিবন্ধিত অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যার ফলে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও স্পেনে থাকা অনিবন্ধিত বাংলাদেশিদের বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান সীমিত, তবে প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত কূটনীতিকদের মতে, বেসরকারি হিসাবে ধারণা করা হচ্ছে যে প্রায় ২০,০০০ বাংলাদেশি এই উদ্যোগের সুফল পাবেন।
এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো স্পেনের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে শ্রমিক শোষণ কমানো এবং দেশটির ক্রমবর্ধমান অভিবাসী শ্রমিক চাহিদা পূরণ করা। স্পেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জাতিসংঘ আগেই সতর্ক করে জানিয়েছে যে, কল্যাণ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ অভিবাসী শ্রমিক প্রয়োজন।
সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করতে গিয়ে স্পেনের অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী এলমা সাইস একে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেন।
তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন,
“আজ আমাদের দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। আমরা মানবাধিকার, একীকরণ, সহাবস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সংহতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি অভিবাসন মডেলকে আরও শক্তিশালী করছি।”
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, স্প্যানিশ সরকার ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারে এবং বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নথিপত্র যাচাই ও প্রক্রিয়াকরণ শুরু হবে। বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই ও প্রক্রিয়ার জন্য ঢাকায় পাঠানো হতে পারে, যা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অনিবন্ধিত অভিবাসীদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে অন্তত পাঁচ মাস স্পেনে বসবাস করেছেন এবং তাদের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই। সফল আবেদনকারীরা প্রাথমিকভাবে এক বছরের আবাসন অনুমতি পাবেন, যা পরবর্তীতে নবায়ন করা যাবে। আবেদন গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা এপ্রিল মাসে এবং জুনের শেষ পর্যন্ত তা চলবে।
অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, ফলে অর্থনৈতিক গতি বজায় রাখতে অভিবাসী শ্রমিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য বড় অর্থনীতির তুলনায় স্পেন ভালো পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে—২০২৫ সালে প্রায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে এবং ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমেছে।
ঢাকার অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং বলেছেন, এমন সময়ে এই সিদ্ধান্ত এলো যখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অনেক দেশ অভিবাসন নীতি কঠোর করছে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (RMMRU)-এর একজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলেন,
“বাংলাদেশের জন্য এটি খুবই ভালো খবর।”
এদিকে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি দালাল চক্র, নথি জালিয়াতি ও প্রতারণার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবস–২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বিদেশে অভিবাসন ব্যবস্থা “বিপজ্জনকভাবে দালাল ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।”
এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ জারি করেছে, যা অভিবাসী চোরাচালান ও নথি জালিয়াতিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূতরা এ অধ্যাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক স্প্যানিশ রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সিসকো দে আসিস বেনিতেজ সালাস স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিবাচক অবদানের প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেন,
“স্পেনে বাংলাদেশিরা খুবই উদ্যোগী ও পরিশ্রমী। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্পেনের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং আমাদের সমাজের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করছে।”
সূত্রগুলো ধারণা করছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত স্পেনে প্রায় ৫০,০০০ বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস করছিলেন, যাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দা এবং পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাদের সন্তানরা স্পেনের স্কুলে পড়াশোনা করছে এবং এই কমিউনিটিকে স্প্যানিশ সমাজে ভালোভাবে একীভূত বলে বিবেচনা করা হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ে বাংলাদেশ স্পেনে ১.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই অঙ্ক ছিল ৩.৫৫ বিলিয়ন ডলার—যা দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে তুলে ধরে।
স্পেনের এই বৈধকরণ উদ্যোগকে জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জ ও শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক অভিবাসন নীতি গ্রহণকারী ইউরোপের প্রধান দেশগুলোর মধ্যে স্পেন নিজস্ব অবস্থানকে পুনর্ব্যক্ত করল।
মন্তব্য (০)