
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সাংবাদিকদের সাথে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ)-এর নেটওয়ার্কিং সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৩০ আগস্ট) ঢাকার গুলশান পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) এর সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দেশের মালিকদের একমাত্র ফেডারেশন হিসেবে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) শিল্প, ব্যবসা ও শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট নীতি প্রণয়ন ও সংস্কারে সামনে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা সরকারের নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে থাকি, এবং দেশের শ্রম-শিল্পসম্পর্ক ও সামাজিক সংলাপের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরি। জাতীয় পর্যায়ে শ্রম আইন সংস্কার, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, দক্ষতা উন্নয়ন, এবং সামাজিক সংলাপ—এসব ক্ষেত্রে বিইএফ-এর অবদান দীর্ঘকাল ধরে স্বীকৃত। একইসাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা বাংলাদেশের মালিকদের মর্যাদা ও অবস্থান সুদৃঢ় করতে কাজ করে যাচ্ছি। সম্প্রতি ২৬ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ৮৯তম ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) সভায় বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনের খসড়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এ সভায় মালিকদের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক মনোভাব প্রদর্শন করেছেন। আমরা সর্বদাই শ্রমিকদের স্বার্থ ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে আসছি। একই সাথে ব্যবসা ও শিল্পের প্রতিযোগিতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও আমাদের অগ্রাধিকার। সভায় মালিকদের পক্ষ থেকে সমঝোতামূলক অবস্থান নেওয়া হলেও, কিছু সংশোধনী প্রস্তাব আমাদের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, মাত্র ২০ জন শ্রমিকের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের সুযোগ শ্রমবাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এটি একাধিক নামসর্বস্ব ইউনিয়নের জন্ম দেবে, যেখানে ব্যবস্থাপনা স্তরকে বারবার চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। এতে কর্মক্ষেত্রে বিরোধ ও বিভাজন বাড়তে পারে, উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে, এবং শিল্পে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অন্যায্য চর্চা ও সুযোগসন্ধানী কার্যকলাপকে উৎসাহিত করতে পারে, যা সুষ্ঠু শিল্পসম্পর্কের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) এর সভাপতি বলেন, আরও বড় ঝুঁকি হলো বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাত, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্প, এমনিতেই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছে। নতুন সংশোধনী যদি অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তবে উৎপাদন ব্যাহত
হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো অর্ডার ডেলিভারি ব্যাহত হতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তখন আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এ অবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক “Reciprocal Tariffs” নীতি এবং নতুন শুল্ক কাঠামোর কারণে রপ্তানি সুযোগ সংকুচিত হওয়ার যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেটি আরও
ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ক্রেতারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ থেকে সহজেই অন্য দেশে অর্ডার স্থানান্তর করতে পারে, ফলে বাংলাদেশ তার বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারাতে পারে।
এছাড়া, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়ার অতিরিক্ত সরলীকরণ বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (FDI ক্ষেত্রেও নিরুৎসাহ তৈরি করতে পারে। কারণ বিনিয়োগকারীরা সবসময় স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য এবং ঝুঁকিমুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ খোঁজেন। যদি তারা মনে করেন শিল্পখাত বারবার শ্রম বিরোধ ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে পড়তে পারে, তবে তারা বিকল্প বিনিয়োগ গন্তব্য বেছে নেবে। এতে দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়ই বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা বিশ্বাস করি, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার অবশ্যই সংরক্ষিত থাকতে হবে, তবে সেইসাথে ব্যবসার স্বাভাবিক পরিবেশ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং শিল্পের স্থিতিশীলতাও সমানভাবে রক্ষা করা জরুরি।
অন্যথায়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা উভয়ই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ফজলে শামীম এহসান আরো বলেন, ফেডারেশন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, শ্রম আইন সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে কিন্তু একই সাথে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকেও প্রতিফলিত করতে হবে। এজন্য নীতি নির্ধারণে সব পক্ষের (সরকার, শ্রমিক, ও মালিক) সমন্বিত মতামত ও আস্থা গড়ে তোলাই হচ্ছে সাফল্যের মূলমন্ত্র। আমরা চাই আপনারা এই প্রক্রিয়ার ইতিবাচক দিকগুলো জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিন। একই সাথে যেসব জায়গায় বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ আছে, সেগুলোকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করুন। আপনাদের গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শ আমাদের কাজকে আরও শক্তিশালী করবে। শেষে আবারও আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। একসাথে কাজ করে বাংলাদেশকে একটি প্রতিযোগিতামূলক, ন্যায়সংগত ও টেকসই অর্থনীতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিইএফ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মন্তব্য (০)